অপারেশন ম্যাক্সিমাস: ‘জঙ্গি দম্পতি’ আত্মঘাতী হয় বাথরুমে, অন্যজন ঘরে

 

অভিযানের পর বড়হাটের জঙ্গি আস্তানায় বাথরুমের ভেতরের দৃশ্যমৌলভীবাজারের বড়হাটে ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাসে’র সময় আস্তানায় থাকা জঙ্গি দম্পতি বাথরুমেই আত্মহনন করে বলে জানিয়েছেন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা। তারা আরও জানান, এই অপারেশনকালে আরেক জঙ্গি আত্মহনন করেছে বাথরুমের পাশেই। জঙ্গিরা আত্মঘাতী হওয়ার আগে তাদের গুরুত্বপূর্ণ নথি ও নগদ অর্থ পুড়িয়ে ফেলে। শুক্রবার রাতে ওই বাসার একটি কক্ষে আগুন ও ধোঁয়া বের হতেও দেখা গেছে। শনিবার অভিযান শেষে ওই বাসায় প্রবেশের পর এই দৃশ্য দেখা গেছে বলে তারা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান।

সিটিটিসি’র উপকমিশনার (ডিসি) মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘আস্তানার ভেতরের একজন পুরুষ ও একজন নারীর লাশ বাথরুমের মধ্যে ছিল। বাথরুমের পাশেই ছিল আরেকজনের লাশ।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, বাথরুমের নারী-পুরুষ দু’জনই স্বামী-স্ত্রী। তাদের তুলনায় অন্য জঙ্গির বয়স কিছুটা কম। আমরা তাদের পরিচয় জানার চেষ্টা করছি।’

অভিযানে অংশ নেওয়া সিটিটিসির কর্মকর্তাদের ধারণা, রাতের কোনও এক সময়ে জঙ্গিরা এক্সপ্লোসিভ বিস্ফোরণের মাধ্যমে আত্মঘাতী হয়েছে। এর আগে তারা আস্তানার ভেতরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ নথি ও নগদ অর্থও পুড়িয়ে ফেলে। জঙ্গি আস্তানা হিসেবে ব্যবহার হওয়া এই বাসাটিতে তিনটি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে দু’টি শয়ন কক্ষ ও একটি বসার ঘর। একটি কক্ষে একটি খাট ও সামান্য কিছু আসবাব রয়েছে। আরেকটি কক্ষে সিঙ্গেল একটি খাট থাকলেও আগুন দেওয়ার কারণে তা পুড়ে গেছে। কক্ষের ভেতর প্লাস্টিকের চেয়ার, ড্রেসিং টেবিল, আলনা রয়েছে। ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে পোশাকসহ বিভিন্ন জিনিস। এছাড়া ডুপ্লেক্স বাড়িটির দ্বিতীয় তলার নির্মাণ কাজ শেষ না হলেও কয়েকটি কক্ষ অব্যবহৃত ছিল। তবে অভিযানের সময় জঙ্গিদের দোতালার কক্ষগুলোতেও ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। গত মঙ্গলবার রাতে অভিযান শুরু হওয়ার পর নারী জঙ্গি সদস্য দোতালার ছাদ থেকে দু’টি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছিল।

অভিযানের পর বড়হাটের জঙ্গি আস্তানার বাথরুমের পাশের কক্ষ

সুইসাইডাল ভেস্টের মাধ্যমে আত্মঘাতী হওয়ায় তিন জঙ্গির কোমর ও পেটের অংশ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করে সিটিটিসির কর্মকর্তারা আরও জানান, ‘বিস্ফোরণে তাদের শরীর ঝলসে গেছে। সোয়াটের অভিযানের চাপে রাতে তারা আত্মঘাতী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

অভিযানে অংশ নেওয়া সিটিটিসির উপ-কমিশনার (ডিসি- ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম) এএইচএম আব্দুর রকিব বলেন, ‘জঙ্গি আস্তানায় নিহত তিন জঙ্গির একজনের বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩২ বছর হবে। নারী জঙ্গির বয়স তার চেয়ে একটু কম এবং অন্য জঙ্গি সদস্য অপেক্ষাকৃত তরুণ। তার বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর হতে পারে।’ অপারেশন ম্যাক্সিমাসে অংশ নেওয়া এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা নিহত তিন জঙ্গির পরিচয় জানার চেষ্টা করছি। পরিচয় জানতে পারলে নিহতদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হবে।

আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নথিপত্র ও নগদ অর্থ

বড়হাটের এই আস্তানায় আত্মঘাতী হওয়ার আগে জঙ্গিরা তাদের কাছে থাকা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও নগদ টাকা-পয়সা পুড়িয়ে ফেলে। যেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের কাছ থেকে সহযোগীদের কোনও সন্ধান না পায় এবং সাংগঠনিক কোনও সিদ্ধান্তের কথা না জানতে পারে। গত বছরের ১ জুলাই রাজধানী ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর ধারাবাহিক যেসব অভিযান চালিয়েছে কাউন্টার টেরোজিম ইউনিট, সেসব আস্তানায়ও অভিযানের সময় জঙ্গিরা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও নগদ টাকা পুড়িয়ে ফেলে।

অভিযানের পর বড়হাটের জঙ্গি আস্তানারে বেডরুম

কাউন্টার টেরোজিম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অপারেশনের চাপের মুখে জঙ্গিরা যখন বুঝতে পারে, তাদের আর পাল্টা প্রতিরোধ করার সক্ষমতা নেই, তখন তারা নিজেদের কাছে থাকা নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলে। এটা তাদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বলে বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিরাও বলেছে।’

ভবনটি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে

মঙ্গলবার মধ্যরাতে বড়হাটের এই জঙ্গি আস্তানাটি ঘেরাও করে রাখা হলেও পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াট সদস্যরা এখানে মূল অভিযান শুরু করে শুক্রবার সকালে। এ সময় জঙ্গিরা ভেতরে অন্তত ১০ থেকে ১২টি বিস্ফোরণ ঘটায়। বিস্ফোরণের কারণে ভবনের ভেতরে পলেস্তরা খসে পড়ে। মেঝেতে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া টানা প্রায় ৩০ ঘণ্টার অভিযানে সোয়াট সদস্যদের অ্যাসল্ট রাইফেলের গুলিতেও ভবনটি বিধ্বস্ত হয়। শুক্রবার বিকেলে পুলিশের আর্মড পারসোনাল ক্যারিয়ার (এপিসি) দিয়ে ভবনের মূল ফটকটিও ভাঙা হয়।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি কুমিল্লা ও সীতাকুণ্ড থেকে গ্রেফতার হওয়া চার জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার মৌলভীবাজারের বড়হাটের জঙ্গি আস্তানাটি শনাক্ত করে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। জেলা পুলিশের সহায়তায় অভিযান চালাতে গেলে জঙ্গিরা পুলিশ সদস্যদের দিকে গুলি ও গ্রেনেড ছোড়ে। এই ভবনের তত্ত্বাবধায়কের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পাশের নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথমে অভিযান চালানো হয় নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানায়। দু’দিনের অভিযান শেষে নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানায় চার শিশুসহ সাত জনের লাশ পাওয়া যায়। সেখানে সুইসাইডাল ভেস্ট পরে শিশুসন্তানদের নিয়ে আত্মঘাতী হয় জঙ্গিরা। এরপর শুক্রবার সকাল থেকে শহরের বড়হাটের  অভিযান শুরু হয়। সবশেষে শনিবার সকালে এই জঙ্গি আস্তানাতে পাওয়া যায় তিন জঙ্গির লাশ।

 আরও পড়ুন: জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ৯ সদস্য হারালো পুলিশ-র‌্যাব

/এমএনএইচ/