জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে সিলেটের বিলাসবহুল বাড়িগুলো পুলিশের নজরে

সিলেটে বিলাসবহুল বাসাবাড়ির তথ্য নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এখন প্রবাসীদের বিলাসবহুল বাসাবাড়ির দিকে। এরই মধ্যে প্রবাসীদের বাসাবাড়ির তথ্য নেওয়ার কাজ শুরু করেছেন বাহিনীর সদস্যরা। আবার প্রবাসীদের বাসাবাড়ির দেখভালের দায়িত্বে থাকা কেয়ারটেকারদের তথ্যও নেবে পুলিশ। সংগৃহীত এসব নিয়ম অনুযায়ী যাচাই-বাছাইও করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রবাসীরা অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের তুলনায় আলিশান বাড়ি নির্মাণেই বেশি আগ্রহী। প্রতিবেশী প্রবাসীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে এসব বাড়ি নির্মাণের কাজ। অনেকেই বাড়ি নির্মাণের কাঁচামাল ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আমদানি করে থাকেন। বিদেশের নকশাবিদদের দিয়েও করানো হয় বাড়ির নকশা। কিন্তু এসব বাড়ি পড়ে আছে অবহেলা আর অযত্নে। বেতনভুক্ত কেয়ারটেকাররা বছরের পর বছর ধরে পাহারা দেন এসব বাড়ি। সিলেট শহর, শহরতলী ছাড়াও বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে সিলেটের গ্রামঞ্চলেও। একেকটি বাড়ি তৈরি করতে খরচ হচ্ছে কোটি টাকার ওপরে।
সিলেটে র্যা ব-৯-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলী হায়দার মো. আজাদ আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর থাকলে হবে না। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদেরও সর্তক থাকতে হবে। ভাড়াটিয়াদের একজনকে অন্যজনের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। প্রবাসীদের বাড়ির কেয়ারটেকারদের সর্তক থাকতে হবে, যেন তাদেরকে ভুল তথ্য দিয়ে জঙ্গিরা বাড়ি ভাড়া নিতে না পারে।’
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার জেদান আল মুসা (গণমাধ্যম) বলেন, ‘মহানগরীর প্রতিটি বিলাসবহুল অলস বাসাবাড়ির দিকে এখন পুলিশের নজর রয়েছে। পুলিশ এসব বিষয়ে তথ্যও নিচ্ছে। সেইসঙ্গে বাসাবাড়ির কেয়ারটেকারদেরও তথ্য নিয়ে যাচাই-বাছাই করা হবে। এক কথায়, পুলিশ এখন এই বিষয়ে ‘হার্ড লাইনে’ আছে।’
সিলেটে প্রবাসীদের পরামর্শসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছে সিলেট ওভারসিজ সেন্টার। তাদের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটে প্রতিবেশী প্রবাসীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ির নকশা ও বাড়ি তৈরির কাজ করা হয়। কে কত টাকা দিয়ে বাড়ি করেছে, এ অঞ্চলে সেই প্রতিযোগিতাই মুখ্য। গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথ, ওসমানীনগর, জগন্নাথপুর, ছাতক, নবীগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজনগর, বড়লেখা ও কুলাউড়াসহ সিলেট শহরে প্রবাসীদের প্রচুর বাড়ি রয়েছে। প্রবাসীরা দেশে বাসাবাড়িসহ জায়গা-জমি কিনে প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন। বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টারে এসব বিষয় নিয়ে প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ জন প্রবাসী অভিযোগ করে থাকেন।
প্রাথমিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সিলেটের চার জেলায় প্রবাসীদের অন্তত হাজারখানেক বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। সিলেটের প্রায় সাড়ে ১০ লাখ মানুষ যুক্তরাজ্যে ও পাঁচ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছেন। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও রয়েছেন সিলেটের প্রায় সাড়ে তিন লাখ বাসিন্দা। আর সৌদি আরবে অবস্থানরত ৩৭ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে সিলেট বিভাগের প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে আট লাখ।
সিলেট ওভারসিজ সেন্টারের নির্বাহী কর্মকর্তা সামসুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণে সিলেটে এগিয়ে আছেন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি প্রবাসীরা। সিলেটের চার জেলায় প্রায় হাজারেরও বেশি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে।’
সামসুল আলম জানান, সম্প্রতি প্রবাসীদের অলস পড়ে থাকা বাসা-বাড়ি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এতে যেন প্রবাসীরা হয়রানির শিকার না হন।
সিলেটের আতিয়া মহলের জঙ্গিবিরোধী অভিযানের পর সচেতন হয়ে উঠছেন বাসাবাড়ির মালিকেরাও। আতিয়া মহলের মালিক উস্তার মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাড়িওয়ালাদের আরও সচেতন হতে হবে। আবার শুধু ভাড়াটিয়াদের তথ্য রাখলেই চলবে না, তাদের গতিবিধিও এখন নজরদারি করা খুবই প্রয়োজন।’
সিলেটের গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘নগরের উপশহরের বি ব্লকে পাঁচতলা ভবনের একটি বাসা কিনেছি গত বছর। সিলেটের পরিস্থিতি দেখে এখন বাসায় তিন জন কেয়ারটেকার রেখেছি। সিসি ক্যামেরাও বসিয়েছি বাসায়।’
/বিএল/টিআর/আপ-এআর/