বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়ে মৌলভীবাজার জেলাসহ সারা দেশে ব্যবসা পরিচালনা করা স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘ফেরদৌস অ্যান্ড সন্স করপোরেশন’-এর জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘নূরজাহান’-এর বিভিন্ন খাদ্যপণ্য নকল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র এই নকল কারবার চালিয়ে আসলেও সংশ্লিষ্ট দফতরের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এই উদ্যোক্তা।
একই সঙ্গে নকল পণ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে বৈধ ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও জরিমানা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা। বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে গত ৩০ আগস্ট মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ‘ফেরদৌস অ্যান্ড সন্স করপোরেশন’ প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. ফেরদৌস ভূঁইয়া রতন।
তিনি বলেন, ‘বৈধ কাগজপত্র ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত আমার প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে ১৫ ডিসেম্বর বিএসটিআইয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করে। এই ব্র্যান্ডের অধীনে বাজারজাতকৃত অনুমোদিত পণ্যগুলোর সিএম এলসি নম্বর নূরজাহান ঘি, সিএম এলসি নং- ০০০০০০০০০০১২৮, নূরজাহান বাটার ওয়েল, সিএম এলসি নং- ০০০০০০০০০০১২৩, নূরজাহান কারী পাউডার, সিএম এলসি নং- ০০০০০০০০০০১২৬, নূরজাহান ও গোফরান সস, সিএম এলসি নং- ০০০০০০০০০০২৩৫৫, রাষ্ট্রীয় সব নিয়মকানুন মেনে এবং যথাযথ ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ করে মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও কমলগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে সততার সঙ্গে পণ্য বাজারজাত করে আসছে।’
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, কুলাউড়ায় অবস্থিত ‘ইকরা এন্টারপ্রাইজ’ এবং টঙ্গীতে অবস্থান ‘শাহা ইন্টারন্যাশনাল’ নামক দুটি প্রতিষ্ঠান আমার ব্যবসায়িক সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস ধরে ফেরদৌস করপোরেশনের ‘নূরজাহান’ ব্র্যান্ডের নাম ও মোড়ক হুবহু নকল করে বাজারে বিক্রি করে আসছে। এর প্রতিকার চেয়ে ২০২৫ সালের ১৭ মে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। কিন্তু ৩-৪ কার্যদিবসের মধ্যে শুনানি হলেও সেখান থেকে কোনও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে সিলেট বিএসটিআই আঞ্চলিক শাখায় আবেদন করা হলে, তার প্রেক্ষিতে কুলাউড়া ও বড়লেখায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ‘ইকরা এন্টারপ্রাইজ’-কে জরিমানা করা হয় এবং নকল পণ্যগুলো বাজার থেকে উত্তোলনের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্দেশ অমান্য করে চক্রটি নকল পণ্য বাজার থেকে না সরিয়ে উল্টো আরও ব্যাপকভাবে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ফেরদৌস ভূঁইয়া রতন আরও জানান, নকলকারী চক্রের প্রভাবে বর্তমানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালককে ম্যানেজ করে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস, বাসাবাড়িতে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে ব্যবসা বন্ধের পাঁয়তারা চালাচ্ছে।
তার অভিযোগ, নকলকারীদের সোর্সের মাধ্যমে যেসব দোকানে ফেরদৌস করপোরেশনের আসল ‘নূরজাহান’ পণ্য রয়েছে তা নিশ্চিত করে সেখানে অভিযান চালানো হয়। পরে দোকানদারদের জরিমানা করে জেলা কার্যালয়ে ডেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ওই কোম্পানির পণ্য বিক্রি না করার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বৈধ লাইসেন্সের কাগজপত্র দেখালেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তা আমলে নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
এ বিষয়ে বড়লেখা বাজারের ‘ছায়েদ স্টোর’-এর স্বত্বাধিকারী সাইদুর রহমান ছায়েদ বলেন, ‘গত ২৪ আগস্ট ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর থেকে ম্যাজিস্ট্রেট দোকানে এসে বিভিন্ন পণ্য পরিদর্শন করেন পরে “নূরজাহান ঘি” বিক্রির দায়ে তিন হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। জরিমানা করার কারণ জানতে চাইলে ম্যাজিস্ট্রেট জানান, এই ঘি বিক্রি করা যাবে না। কারণ এর কোনও অনুমোদন নেই। তখন আমি জানাই যে, অনুমোদন না থাকলে কোম্পানি পণ্য বিক্রি করবো না। এই কোম্পানির মালিক আছে এবং ঘি কেনার মেমোও আমার কাছে আছে, এর জবাবে ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, নূরজাহান ঘি বিক্রি করলেই জরিমানা করা হবে, কারণ এই পণ্যটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’
একই অভিযোগে কুলাউড়ার দক্ষিণ বাজার সুমাইয়া স্টোরের স্বত্বাধিকারী আতর আলীকে ১৫ হাজার টাকা, বড়লেখার রথলী বাজারের জননী ভ্যারাইটিজ স্টোরের স্বত্বাধিকারী সুমন কপালীকে মৌলভীবাজার ভোক্তার কার্যালয়ে ডেকে গত ২৭ আগস্ট ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
ফেরদৌস ভূঁইয়া রতন বলেন, ‘নূরজাহানের সকল পণ্য কোম্পানিকে ফেরত দিতে এবং এসব পণ্য বিক্রি করা যাবে না বলে জানান ম্যাজিস্ট্রেট। অথচ নূরজাহানের নকল পণ্য দীর্ঘদিন ধরে বাজারে সয়লাভ- সেখানে ভোক্তা অধিদফতর জরিমানা না করে উল্টো আমার নিরীহ ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও জরিমানা করছেন।’
জুড়ী বাজারের ‘জান্নাত স্টোর’-এর মালিক জনি মিয়া বলেন, “নূরজাহান ঘি বিক্রির দায়ে আমাকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আমি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সরকারি অনুমোদিত কাগজপত্র দেখালেও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর তা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেয়।”
জুড়ীর কামিনীগঞ্জ বাজারের ‘মেসার্স জয়জিৎ এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক টিংকু দেব বলেন, “ভোক্তা অধিদফতরের কর্মকর্তা নূরজাহান বাটার অয়েল রাখার দায়ে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। কিন্তু মূলত জরিমানা কাগজে উল্লেখ করেছেন নূরজাহান ঘি। জরিমানার পরদিন মৌলভীবাজার ভোক্তা অধিদফতরের অফিসে ডেকে সারাদিন বসিয়ে রেখে সন্ধ্যায় ৩ হাজার টাকা রেখে চলে যেতে বলেন। সেটা নাকি অফিস খরচ। নকল পণ্যের ওপর ব্যবস্থা না নিয়ে আমাদের মতো বৈধ ব্যবসায়ীদের এভাবে জরিমানা করায় আমরা চরম বিপাকে পড়েছি।”
উদ্যোক্তা মো. ফেরদৌস ভূঁইয়া রতন বলেন, ‘শত শত বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারের কোষাগারে নিয়মিত রাজস্ব দিয়েও আজ কতিপয় দুষ্কৃতকারীর চক্রান্তের কারণে আমার ব্যবসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সরকার যখন দেশের তরুণ সমাজকে উদ্যোক্তা হতে নানাভাবে উৎসাহ দিচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে বৈধ পণ্য ও সম্মান নষ্ট হতে বসেছে।’
ফেরদৌস ভূঁইয়া রতন এই পরিস্থিতিতে একটি বৈধ প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি অবিলম্বে নকল পণ্য বাজার থেকে উচ্ছেদ এবং জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মৌলভীবাজার জেলাসদরসহ জুড়ী, বড়লেখা, কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন বাজারের অধিকাংশ দোকানে ছেয়ে গেছে মানহীন ও ভেজাল পণ্যে। বাজারজুড়ে যেসব মানহীন পণ্য পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে নিউ তীর ঘি, ঘোষবাড়ীর ঘি, নূরানী সস ও নূরানী মসলা, সিয়াম ঘি ও সিয়াম মসলা, বিসমিল্লাহ ঘি ও মসলা, শাহী ঘি ও শাহী বাটার অয়েল, হিরো ঘি ও গোল্ডেন ঘি- এসব পণ্যের প্যাকেজিংয়ে নামমাত্র প্রস্তুতকারকের ঠিকানা বা মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঠিক তথ্য না থাকলেও জেলার প্রতিটি দোকানে এগুলো দেদারছে বিক্রি হচ্ছে।
উল্লেখিত পণ্য বিক্রির কারণ জানতে চাইলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, বিক্রেতারা পণ্যগুলো দোকানে রেখে যান এবং বিক্রির পর তাদের পাওনা টাকা বুঝিয়ে দিতে হয়। অনেক সময় বিক্রির টাকা পুরোপুরি পরিশোধও করা হয় না। যেমন—কুলাউড়ার এক দোকানির দোকানে ইনাম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি প্রায় দেড় লাখ টাকার ঘি বাকিতে সরবরাহ করছেন।
জেলার ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) বৈধ উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, একই প্রতিষ্ঠানে বারবার অভিযানের নামে অতিরিক্ত আর্থিক জরিমানা ও হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিকে টিকিয়ে রাখতে এসব হয়রানিমূলক আচরণ বন্ধ করে যেকোনো পরিদর্শন বা অভিযান নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সচেতন মহলের ভাষ্যমতে, একটি চক্র অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মানহীন ও ক্ষতিকর পণ্য বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মৌলভীবাজার বিজনেস ফোরামের আহ্বায়ক ও চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক নুরুল ইসলাম কামরান ব্যবসায়ীদের সরকারি নিয়ম-কানুন মেনে চলার পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমবার ছোটখাটো অনিয়মের ক্ষেত্রে বড় জরিমানা না করে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং আলাদা অভিযানের পরিবর্তে একটি সমন্বিত পরিদর্শক ব্যবস্থা চালু করা দরকার।’ এ ছাড়া সরকারি সংস্থার সাথে আলোচনার মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমস্যা তুলে ধরার তাগিদ দেন তিনি।
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মানুষকে সচেতন করা এবং ভালো পণ্য রাখতে উদ্বুদ্ধ করাই আমার কাজ। তবে সঠিক কাজ করতে গেলে অনেক সময় নানা অভিযোগ ওঠে, যা সরকারের কার্যক্রমকে থামাতে পারে না।”
দোকানিদের নির্দিষ্ট কোনও পণ্যের ওপর জরিমানা করা হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অভিযানে গিয়ে কোনও নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর এককভাবে জরিমানা করা হয় না, বরং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই জরিমানা করা হয়।”
টাকা দিলে ভুয়া বিএসটিআইয়ের কাগজপত্র পাওয়া যায় এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “এ ধরনের কোনও কথা কোনও দোকানদারের কাছে বলা হয়নি। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে সরকারি দফতর বা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কীভাবে কথা বলবো আমি।”
অভিযান পরিচালনার সময় স্বচ্ছতা ও নিয়মনীতি কতটুকু মানা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেখানে কোনও অস্বচ্ছতা নেই, বরং আইন ও ধারা অনুযায়ীই জরিমানা করা হয়ে থাকে। তবে নূরজাহার ঘি বিক্রির না করার জন্য কোনও ব্যবসায়ীকে বলি নাই। আর সেটা বলাও আমার ঠিক হবে না।”
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলে, “এ বিষয়ে এখনও কোনও লিখিত অভিযোগ হাতে পাইনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”