বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি, বিধি প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন ও নীতিনির্ধারণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার সুযোগ পান একজন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট। সিনেট সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে তারা এ ভূমিকা পালন করেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। এর মধ্যে আজীবন সদস্য (লাইফ মেম্বার) প্রায় ৫৩ হাজার এবং তিন বছরের মেয়াদি সদস্য প্রায় ৭ হাজার। তাদের ভোটে নির্বাচিত হন সিনেট সদস্যরা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে মোট ১০৫ জন সদস্য রয়েছেন। কোনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা হলো সিনেট।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) সাবেক উপাচার্য এবং সাবেক সিনেট সদস্য ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটরা শুধু ভোটার নন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। সিনেট হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা। রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটরা যেমন সিনেট সদস্য নির্বাচন করেন, তেমনি নিজেরাও নির্বাচিত হতে পারেন। জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটি যেমন আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখে, তেমনি সিনেট এক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেকেন্ড পার্লামেন্ট’ হিসেবে কাজ করে।’
রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট কারা, তাদের ভূমিকা কী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট বলতে এমন একজন স্নাতককে বোঝায়, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নিজেকে নিবন্ধন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের অন্যতম প্রধান ভূমিকা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনে অংশ নেওয়া। উদাহরণ হিসেবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী একজন ব্যক্তি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এবং প্রয়োজনীয় নিবন্ধন সম্পন্ন করলে তিনি রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট হতে পারেন। এরপর তিনি রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিদের নির্বাচনে ভোট দিতে এবং প্রার্থী হতে পারেন।
তবে তাদের ভূমিকা শুধু ভোট দেওয়া বা প্রার্থী হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা সিনেট সদস্য নির্বাচন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন। আবার নিজেরা সিনেট সদস্য নির্বাচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও অংশ নিতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ জন নির্বাচিত সিনেট সদস্যের মধ্যে ৩৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের ভোটে নির্বাচিত হন। নির্বাচিত এসব প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন।
কীভাবে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট হবেন
রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট হওয়ার জন্য সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ফরমে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি পরিশোধ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। এর মধ্যে আজীবন সদস্য প্রায় ৫৩ হাজার এবং তিন বছরের সদস্য প্রায় ৭ হাজার।
রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট হতে হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন পোর্টালে নিবন্ধন করতে হয়। নিবন্ধনের সময় বিভাগ, অনার্স বা মাস্টার্স পাসের সাল, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট সাইজের ছবি, মোবাইল নম্বর ও ই-মেইলসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ডিগ্রি অর্জনের তিন বছর পর নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা যায়। রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে। ওই সময়ের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন না করলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে ভোট দেওয়া যায় না। তবে পরে আবার নিবন্ধন করা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্ট্যাটিউট অনুযায়ী রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট নিবন্ধনের মেয়াদ তিন বছর। মেয়াদ শেষ হলে নির্ধারিত ফি দিয়ে আরও তিন বছরের জন্য নবায়ন করতে হয়। সময়মতো নবায়ন না করলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটের মর্যাদা হারান।
লাইফ মেম্বার হওয়ার শর্ত ও সুবিধা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে লাইফ মেম্বার হতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, সমমান বা তার ঊর্ধ্বের ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। ডিগ্রি অর্জনের পর কমপক্ষে তিন বছর অতিক্রান্ত হতে হবে, যা ফল প্রকাশের তারিখ থেকে গণনা করা হয়।
এ ছাড়া নির্ধারিত আবেদনপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং লাইফ মেম্বার ফি জমা দিতে হবে। আবেদন যাচাই শেষে বিশ্ববিদ্যালয় লাইফ মেম্বার হিসেবে নিবন্ধন দেয়।
লাইফ মেম্বার হলে একবার নিবন্ধন করলেই বারবার তিন বছর পরপর নবায়ন করতে হয় না। রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট হিসেবে সদস্যপদ আজীবন বহাল থাকে। পাশাপাশি সিনেট নির্বাচনে ভোটার হওয়ার এবং যোগ্যতা সাপেক্ষে প্রার্থী হওয়ার সুযোগও থাকে।
সিনেট সদস্যের কাজ কী
সিনেট সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেট আলোচনা ও অনুমোদন করেন। তারা শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেন।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, সংবিধি, অধ্যাদেশ ও প্রবিধান প্রণয়ন, সংশোধন ও অনুমোদনের দায়িত্বও তাদের ওপর বর্তায়। সিন্ডিকেটের কার্যক্রম তদারকি, বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মতামত প্রদান এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত নির্দেশনাও তারা দিয়ে থাকেন।
সিনেট সদস্যরা সমাবর্তনে ডিগ্রি প্রদানের অনুমোদন দেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন ও উন্নয়নসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ এবং আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদন ও আর্থিক বিষয়ও পর্যালোচনা করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ৬০ জন নির্বাচিত সিনেট সদস্যের মধ্যে ৩৫ জনই রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের ভোটে নির্বাচিত হন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির উন্নয়ন, আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ক্ষেত্রে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতেও তাদের ভূমিকা রয়েছে।’