বর্ষা মৌসুমে কি পাবলিক পরীক্ষা থাকা উচিত

এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষা এগিয়ে আনতে শিক্ষা ক্যালেন্ডারকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালে সিলেটে বন্যা কারণে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের বন্যা ততটা বিপজ্জনক না হলেও এবার টানা ভারী বৃষ্টিতে পরীক্ষার্থীরা ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়ে। বিশেষ করে বৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রামের অবস্থা বেশি বিপর্যস্ত হওয়ায় এই শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে সরকার। যদিও বন্যা পরিস্থিতি চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনীসহ প্রায় ৪৩টি জেলায় বিস্তার লাভ করে। এসব জেলার পরীক্ষার্থীরাও ভোগান্তির শিকার হন। তারা সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর পরীক্ষা স্থগিত করার দাবি জানান। সরকার দাবি না মানায় একপর্যায়ে পরীক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, বর্ষা মৌসুমে কি পাবলিক পরীক্ষা রাখা উচিত?

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে বিগত প্রায় দশক ধরে ফেব্রুয়ারির শুরুতে এসএসসি ও সমমান এবং এপ্রিলের শুরুতে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ার একটা রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ অতি মারির কারণে ২০২০ সালে ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আগের রেওয়াজ অনুযায়ী যথাসময়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৪ সালে এসেও এই দুটি পাবলিক পরীক্ষা আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব হয়নি।

২০২৪ সালের ২০ জুন সিলেট বিভাগের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ৮ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তখনই শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মহল থেকে দাবি উঠেছিল—বর্ষা মৌসুম এড়িয়ে পরীক্ষা নিতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষাবর্ষকে ঢেলে সাজাতে হবে। যদিও তৎকালীন সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি।

মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতায় এসে বর্তমান সরকার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নেয় এবং পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণা করে। ফলে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা পুরো বর্ষা মৌসুমে পড়ে।

অনেকে মনে করেন, সরকারকে সঠিক পরামর্শ দিতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। ফলে বৃষ্টি আর বন্যায় পরীক্ষার্থীরা যেমন ভোগান্তি শিকার হয়েছে, তেমনই সরকারকেও বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। যদিও পরীক্ষা এগিয়ে আনার বিষয়ে আন্তরিকতার কথা জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ১৪ মে তিনি জানিয়েছিলেন, ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানর পরীক্ষা ওই বছরের ৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে। সেদিন তিনি বলেন, ‘‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এসএসসি শুরু করবো ২০২৭ সালের ৭ জানুয়ারি এবং তাদের পরীক্ষা শেষ হবে ওই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি।’’

শিক্ষার্থীদের যাতে সময় নষ্ট না হয় সে জন্য তিনি বলেছিলেন, দেরিতে পরীক্ষা নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের এক বছর নষ্ট হয়ে যায়। এই গ্যাপটাকে ক্রমান্বয়ে আমরা ক্লোজ করতে চাচ্ছি। ধরে নিচ্ছি ডিসেম্বর ইজ দ্য এন্ড অব দ্য ইয়ার এবং এটা হলো এক্সামিনেশন মান্থ। সেদিকে আমরা এগোচ্ছি।’’

এরপর গত ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষে (২০২৭ সালে) জানুয়ারিতে এসএসসি, জুনে এইচএসসি পরীক্ষার নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমান সরকার শিক্ষাবর্ষকে সময়োপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে।’’

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘শিক্ষা ক্যালেন্ডার যেটা করা হয়েছে, সেটা এত দ্রুত না করে আরেকটু সময় নিয়ে করা দরকার ছিল। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক কেউই এটা হজম করতে পারছেন না, এরকম মনে হচ্ছে। আরেকটু সময় নিয়ে, আরেকটু বিচার-বিশ্লেষণ করা দরকার ছিল।’’

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে না নিয়ে পরীক্ষা এগিয়ে আনার স্বার্থে সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করার বিষয়ে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সেটা করে পরীক্ষা নিলে বাচ্চাদের এভাবে বন্যার মধ্যে পরীক্ষা দিতে হতো না। শিক্ষা এমন একটা বিষয়, এটা তো হামের টিকা না, যে দিতেই হবে। আরেকটু সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে, পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমরা আশা করেছিলাম নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটা সরকার এসেছে। আস্তে আস্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের দিকে যাবে। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা আছে। সরকার এটাকে সামাল দিতে পারছে না কেন, বুঝতে পারছি না।’’

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘‘শিক্ষার্থীরা যখন-তখন যেমন খুশি তেমন, আন্দোলনে নেমে গেল। এটাকে আলোচনার মাধ্যমে করা যেত না? আমার মনে হয় নীতিনির্ধারকরাও বুঝতে পারেননি যে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়ে এসেছে। মানসিক অস্থিরতার মধ্যেই তারা দিনযাপন করেছে।’’

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, ‘‘ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। বিভিন্ন ঋতুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আছে। হেমন্তের শুরু থেকে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়টাতে অতিবৃষ্টি, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগের প্রভাব তুলনামূলক কম থাকে। সেই বিবেচনায় পাবলিক পরীক্ষা, বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো গ্রীষ্মের দাবদাহ প্রকট হওয়ার আগেই সম্পন্ন করলে কোমলমতি শিশুদের জন্য ভালো হয়।’’