অবসরে যাওয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সুখবর আসছে

অবশেষে ২০২২ সালের পরের বেসরকারি (এমপিওভুক্ত) শিক্ষকদের অবসরভাতা কার্যক্রম চালু হতে যাচ্ছে। চলতি আগস্টে দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে এই অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। ইএফটি ও আইবাসের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক শুক্রবার (৭ আগস্ট) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সর্বোত্তম চেষ্টা করবো। ইএফটি ও আইবাসের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আগামী ১৫ আগস্ট দেশের ৬৪ জেলায় জেলা প্রশাসকদের কাছে তালিকা থাকবে। শিক্ষকরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আইবাস এবং ইএফটির মাধ্যমে আমরা শুধু তাদের নামে ওই টাকাটা ট্রান্সফার করবো।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সাল থেকে অবসরসুবিধার ৬৭ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। এর কারণ তহবিল ঘাটতি আছে ৭ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। এসব শিক্ষকের মধ্যে কয়েকজন কল্যাণভাতা পেলেও বেশিরভাগেরই বাকি আছে। এর সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায়নি। তবে সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২১ জুন পর্যন্ত কল্যাণভাতার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার।

গত কয়েক বছরের অবসর ও কল্যাণভাতা পরিশোধে ধীরগতির কারণে অনিষ্পন্ন আবেদনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। গত দুই বছরে এই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। শিক্ষকরা বলছেন, বেসরকারি শিক্ষকদের সামান্য এই অর্থ শেষ জীবনে চিকিৎসাসহ অন্যান্য ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে। এই অর্থ পরবর্তী জীবন চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই অর্থ না পেয়ে অনেক হাজার হাজার শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

গত ২৯ জুন সংসদ সদস্য মো. আব্দুল ওয়ারেছ জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষিকারা অবসর গ্রহণের পর দীর্ঘদিন ধরে অবসরকালীন ভাতাদি না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

অবশ্য এর আগেই গত ৪ জুন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছিলেন, ২০২২ সালের পরের বেসরকারি শিক্ষকদের অবসরভাতা কার্যক্রম মাস খানেকের মধ্যেই চালু হবে। এর ধারাবাহিকতায় এক মাস পর এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ওইদিন শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০২২ সালের পর থেকে কল্যাণ ট্রাস্ট এবং অবসরভাতার অনুদান দেওয়া হচ্ছিল না। ২০২২ সালের পর থেকে যেসব শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা পাননি, তাদের অবসরভাতা চালু করবে সরকার। এ ভাতা চালু করতে দুই হাজার কোটি টাকার একটি থোক বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

অবসরসুবিধার ৬৭ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন, তহবিল ঘাটতি ৭ হাজার ৪১০ কোটি টাকা

গত ২৯ জুন জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ডে প্রায় ৬৭ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। তিনি বলেন, একজন শিক্ষক-কর্মচারী গড়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা অবসরভাতা পেয়ে থাকেন। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও বর্তমানে অবসর তহবিলে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। ফলে প্রায় ৭ হাজার ৪১০ কোটি টাকার অর্থ ঘাটতি রয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২১ জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার এককালীন বরাদ্দ প্রয়োজন। সরকার ইতোমধ্যে অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের আর্থিক সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।

এছাড়া আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর জন্য সফটওয়্যার পুনরায় চালু, জনবল বৃদ্ধি, অনলাইন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আইবাস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে অবসরসুবিধা বোর্ডের বর্তমান অনিষ্পন্ন আবেদনগুলো ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো— ভবিষ্যতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা যাতে অবসর গ্রহণের ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যেই তাদের প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণসুবিধা গ্রহণ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

নিষ্পত্তির অপেক্ষায় কল্যাণসুবিধার ৪৫ হাজার আবেদন

গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২১ জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার এককালীন বরাদ্দ প্রয়োজন।

সরকার ইতোমধ্যে অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের আর্থিক সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এছাড়া আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর জন্য সফটওয়্যার পুনরায় চালু, জনবল বৃদ্ধি, অনলাইন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং আইবাস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে অবসরসুবিধা বোর্ডের বর্তমান অনিষ্পন্ন আবেদনগুলো ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো— ভবিষ্যতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা যাতে অবসর গ্রহণের ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যেই তাদের প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণসুবিধা গ্রহণ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এর আগে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য সুবিধা দ্রুত প্রদানের লক্ষ্যে সরকার ও কল্যাণ ট্রাস্ট বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৯ হাজার ২৮৪ জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীকে ৫৫৩ কোটি ৬৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৪ টাকা কল্যাণসুবিধা প্রদান করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জমাকৃত সব আবেদন নিষ্পত্তি করে আইবাস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবে অর্থ প্রেরণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের জুন ও জুলাই পর্যন্ত জমাকৃত আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করে অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম প্রস্তুত করা হয়েছে।

এছাড়া অনিষ্পন্ন প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির জন্য এককালীন প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান এবং আবেদনসমূহ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।

কল্যাণ ফান্ডে ঘাটতি প্রতিবছর ১৫৬ কোটি টাকা

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন গত ১৪ জুন জানিয়েছিলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট-১৯৯০ সালের ২৮ নম্বর আইন এবং ‘প্রবিধানমালা, ১৯৯৯’ অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতনের ৪ শতাংশ চাঁদার অর্থে পরিচালিত একটি আর্থিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। কল্যাণ ট্রাস্টের একমাত্র আয়ের উৎস শিক্ষক-কর্মচারীদের চাঁদা এবং এর বিনিয়োগজনিত মুনাফা।

বর্তমানে ট্রাস্টের বার্ষিক মোট আয় প্রায় ৬৮৪ কোটি টাকা। অপরদিকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণসুবিধা প্রদান বাবদ বার্ষিক প্রয়োজন প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা। ফলে প্রতিবছর প্রায় ১৫৬ কোটি টাকার ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির কারণে দায়ের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই আর্থিক ঘাটতির কারণেই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা প্রদান বিলম্বিত হচ্ছে।