বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে শুক্রবার (২৪ জুলাই) কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার একক সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাকে সম্মাননাও জানানো হবে। একক কনসার্ট ও সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এন আই বুলবুল।
বাংলা ট্রিবিউন: শিল্পকলায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আপনাকে নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে। এটি নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই...
রুনা লায়লা: আমি প্রথমবারের মতো শিল্পকলায় এমন আয়োজনে অংশ নিচ্ছি। আমার ছয় দশকের ক্যারিয়ারে এর আগে কখনও শিল্পকলায় গান করিনি। সে কারণে আয়োজনটি আমার জন্য বিশেষ। আজ (বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই) দুপুরে শিল্পকলাতেই আগামীকালের আয়োজনের জন্য মহড়া করেছি। আমার সঙ্গে মঞ্চে আরও অনেক গুণী যন্ত্রশিল্পী থাকবেন। তাঁদের নিয়ে আশা করছি, সুন্দরভাবে আয়োজনটি উপহার দিতে পারব।
বাংলা ট্রিবিউন: এই আয়োজনে শ্রোতারা আপনার কাছ থেকে কোন কোন গান শুনতে পারবেন?
রুনা লায়লা: আমি প্রায় ১০টি গান গাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি। এর মধ্যে রয়েছে—‘শিল্পী আমি তোমাদের গান শোনাবো’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি’, ‘বন্ধু তিন দিন তোর বাড়ি গেলাম’, ‘সাধের লাউ বানায়লো মোরে বৈরাগী’ ও ‘মাস্ত কালান্দার’।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ৬২ বছরের ক্যারিয়ারে অনেক পরিবর্তন দেখেছেন। এ সময়ে নিজেকে কীভাবে মানিয়ে নিয়েছেন?
রুনা লায়লা: আমি সব সময় নতুনের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন অনেক কিছু আমাদের সামনে আসে। সেগুলোকে বাদ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিছুদিন আগে নতুন প্রজন্মের শিল্পী প্রীতমের সঙ্গে গান করেছি। তাঁর সুরে ‘জ্বালা’ গানটি নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলেছে। এ ছাড়া সম্প্রতি বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গেও একটি গান করেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পী ও সংগীত পরিচালক প্রযুক্তিনির্ভর। এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
রুনা লায়লা: প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমে ভালো কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব। কিন্তু আবেগ বা ইমোশন প্রযুক্তি দিতে পারে না। এখন অনেকে অটো-টিউন ব্যবহার করেন। আমি এই অটো-টিউন ব্যবহার করি না। আমরা একটা সময় লাইভে গান রেকর্ড করতাম। এখন সেটা হচ্ছে না। তবে ইচ্ছা করলে আবেগ দিয়েও একটি গান রেকর্ড করা সম্ভব। কিন্তু নতুনদের কেউ কেউ রেকর্ডিংয়ে এক লাইন, দুই লাইন করে গান গায়। এভাবে তো গানের মূল আবেগ সৃষ্টি হয় না।
বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে আপনার ভক্ত-শ্রোতার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই তিন দেশের শ্রোতাদের ভালোবাসার মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য অনুভব করেন?
রুনা লায়লা: ভারতের সাংবাদিক খুশবন্ত সিং একবার আমার একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। কনসার্ট শেষে তিনি বলেছিলেন, ‘গান শুধু শোনার বিষয় নয়, দেখারও বিষয়।’ তিনিই ফারাক্কার বিনিময়ে আমাকে চেয়েছিলেন। এটা শুধু ভালোবাসা থেকেই বলা হয়েছিল। ভালোবাসার আলাদা ভাগ হয় না। শ্রোতাদের ভালোবাসাই যে কোনও শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার কারণেই আজও গান করছি। আমি কোনও দেশের শ্রোতার ভালোবাসাকে কখনও আলাদাভাবে দেখিনি।
বাংলা ট্রিবিউন: ক্যারিয়ারে কখনও কঠিন সময় পার করেছেন? সেটি কীভাবে অতিক্রম করেছেন?
রুনা লায়লা: আমাকে বিভিন্ন সময়ে তিনবার বয়কট করা হয়েছে। সেই সময়গুলো আমার জন্য কঠিন ছিল। কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস, যোগ্যতা এবং শ্রোতাদের ভালোবাসায় সবকিছু পেরিয়ে এসেছি। যে কাউকে নিজের যোগ্যতায় এগিয়ে যেতে হয়।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার গানের সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে কোন গানটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি শিহরিত করে?
রুনা লায়লা: আমার গানের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। প্রতিটি গানের কথা ও সুর পছন্দ হওয়ার পরই গেয়েছি। তবে এত গানের মধ্যে ‘মাস্ত কালান্দার’ গানটির কথা একটু আলাদাভাবে বলতে হয়। যে কোনও সময় এই গানটি গাওয়ার পর আমি একটু অন্য রকম হয়ে যাই। দেশের বাইরেও এই গানের শ্রোতাদের পাগলামি দেখেছি। একবার একটি অনুষ্ঠানে এক শ্রোতা অজ্ঞান হয়েও এই গানের সুরে প্রলাপ বকছিল।
বাংলা ট্রিবিউন: নতুন প্রজন্মের প্লেব্যাক শিল্পীদের নিয়ে নানা ধরনের কথা শোনা যায়। তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
রুনা লায়লা: আমরা সব সময় জানতাম, পর্দায় কে গানটির সঙ্গে ঠোঁট মেলাবেন কিংবা গানটি কোন ধরনের দৃশ্যে ব্যবহার হবে। সেসব জেনেই কণ্ঠ দিতাম। এখন তো সেভাবে গান হচ্ছে না। এ কারণে অনেক সময় সিনেমার গান শ্রোতাদের মনে দাগ কাটে না। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের বলব, চর্চার কোনও বিকল্প নেই। যে যত বেশি চর্চা করবে, সে তত বেশি টিকে থাকবে।