ছেলেবেলা কেটেছে মুম্বাইয়ে। বড় হয়ে কলকাতায় আসা। ‘বউ কথা কও’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করলেও ঋতুপর্ণ ঘোষের হাত ধরে ‘গানের ওপারে’-তে তিনি দর্শকের নজরে আসেন। বড়পর্দায় পা রাখা ২০১২-এ অনীক দত্তর ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবির মাধ্যমে। এরপর অঞ্জন দত্ত থেকে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে তিনি চরিত্রে নিজের ছাপ রেখেছেন। এখন মুম্বাই নিবাসী তিনি। পোষ্যদের টানে কলকাতায় আসেন মাঝেমধ্যেই।
কলকাতায় থাকাকালে বেশ মনের মতো কাজ করছিলেন অনিন্দিতা। শিকড়ের টানেই কি ফের মুম্বাই ফিরে যাওয়া? অনিন্দিতার মতে, ‘আমার জন্য তো এটা কোনও চ্যালেঞ্জিং বিষয় নয়। কারণ, আমি তো মুম্বাইয়ের মেয়ে। ওখানেই বড় হয়েছি, আমার বাড়ি, মা-বাবা সবাই রয়েছেন। একটা জিনিসই কঠিন। সেটা হলো নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করা। কঠিন বটে, কিন্তু খুব মজারও।’
মুম্বাই থেকে কলকাতায় এসে ঋতুপর্ণ ঘোষের সান্নিধ্যে আসেন অনিন্দিতা। ‘গানের ওপারে’ ধারাবাহিকে কাজ করেন। কলকাতায় এসে ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না তার। পুরনো স্মৃতির পাতা নাড়িয়ে নায়িকা বলেন, ‘আমার জন্য তখন এটা নতুন শহর। দ্বিতীয়ত, ভাষাগত নানা সমস্যার মুখে পড়েছিলাম। কারণ মুম্বাইয়ে যেহেতু বড় হয়েছি, বাংলায় খুব কম কথা হতো। আর বাড়িতে যতটুকু যা বলতাম, মা-বাবার মনে হতো যে বা কি কিউট বাংলায় কথা বলছে। কিন্তু এটা পরে কলকাতায় এসে বুঝলাম আমি।’
ইন্ডাস্ট্রিতে আসার পর কীভাবে নিজেকে মেলে ধরলেন অনিন্দিতা? এই পরিবেশের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে পেরেছিলেন? নায়িকা বলে ওঠেন, ‘আসলে আমি ইন্ডাস্ট্রিতে আসার পরে আমার সঙ্গে ‘‘আউটসাইডার’’-এর মতোই ব্যবহার করা হয়েছে। ও একটু ‘‘ট্যাঁশ’’—এই শব্দটা অনেক বার শুনেছি। আমি নাকি একটু ‘‘ট্যাঁশ’’দের মতো বাংলা কথা বলি।’
নায়িকা বলে চলেন, ‘কষ্ট হয়েছিল প্রথম দিকে ঠিকই, কিন্তু আমি তখন চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়ে বাংলা শিখলাম, পড়তে শিখলাম, লিখতে শিখলাম। বাড়িতে এসে আমাকে এক শিক্ষক বাংলা শেখাতেন। তখন আমি আমার প্রথম সিরিয়াল ‘‘বউ কথা কও’’ করছি। এখনও যে সম্পূর্ণ ঠিক হয়েছে তা নয়, কিন্তু আমি চেষ্টা করছি।’
ক্যারিয়ারের প্রথমেই ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে দেখা হওয়া এবং তার সঙ্গে কাজ করা যে কোনও অভিনেতার কাছেই বড় পাওয়া। অনিন্দিতা মনে করেন, এটা তার কাছে ভগবানের আশীর্বাদের মতো। ‘রবি ওঝার হাত ধরে ‘বউ কথা কও’ শুরু করি, রবিজি আমাকে অভিনয়ের নানা প্রযুক্তি শিখিয়েছেন। আর ঋতুদা আমাকে অভিনয় ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন। আমি তার আগে কখনও ভাবিনি যে আমি পেশাগত ভাবে অভিনয় করবো। বরং আমার প্রোডাকশন ডিজাইনিংয়ের দিকে ঝোঁক ছিল। সেই থেকে অডিশন দিতাম, হঠাৎই সুযোগ এলো আর ভালবেসে ফেললাম অভিনয়কে। আমি তো তখন কাদার তাল, আমাকে গড়ে তুলেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।’
২০১৩ সালে গৌরব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় অনিন্দিতার। উত্তমকুমারের বাড়ির বউ হয়ে যাওয়া। নিজেকে মানিয়ে নিতে কোনও অসুবিধা হয়েছিল? অনিন্দিতা বলেন, ‘আমি আসলে ওই নামের নামের ভারটা নিয়ে আলাদা করে ভেবে দেখিনি। বিয়ে আর পরিবার, দুটো জিনিসকে একদম একভাবে ভাবিনি। আমার জন্য এটা ছিল শুধু আমার সঙ্গীর সঙ্গে থাকা। ব্যস, এর বাইরে কিছু আর ভাবিনি। এখনও ও আমার বন্ধু।’
নায়িকার চরিত্র খুব কমই করেছেন অনিন্দিতা। তবে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রেই দেখা গিয়েছে তাকে। অনীক দত্ত, অঞ্জন দত্ত, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করেছেন। এরপর কাজ কমিয়ে দিলেন অনিন্দিতা। এ প্রসঙ্গে অভিনেত্রীর মত, ‘যেভাবে চরিত্র এসেছে আমি করেছি। আর যে চরিত্র আমার মনে হয়েছে যে, এক ধরনের হয়ে যাচ্ছে, সেই চরিত্রের ক্ষেত্রে একটু না বলেছি। ক্যারিয়ারের প্রথমে সবই করতে চাইতাম। আট বছর টানা কাজ করে আমি হাঁপিয়ে পড়ি। মনে হতো নিজেকেই হারিয়ে ফেলছি। কখনও নলিনী, কখনও ঝিনুক, কখনও রিঙ্কা হয়ে আছি, কিন্তু এইসব চরিত্রের ভিড়ে অনিন্দিতা বসুকে হারিয়ে ফেলেছি। তাই একসময় নিজেকে বলেছিলাম যে, এ বার একটু থামো।’
অনিন্দিতা বসুকে খুঁজে পাওয়ার জন্যই মুম্বাইয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন অনিন্দিতা। নিজের সঙ্গে খানিকটা সময় কাটাতে চেয়েছিলেন তিনি। তার সমাজমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যাবে, তিনি মি-টাইম কাটাতে ভালবাসেন। মুম্বইয়ে কখনও একা লাগে? অনিন্দিতার জবাব, ‘না, নিজের সঙ্গে সময় কাটানো, নিজেকে ভালোবাসা, সেটা সবার আগে জরুরি। আমার মনে আছে প্রায় ৫০টা অডিশন দেওয়ার পর আমি মুম্বইয়ে প্রথম কাজ পেয়েছিলাম। একটা বিজ্ঞাপনী ছবির কাজ করেছিলাম। তারপর যেটা বুঝলাম, শহরকে আমার উপস্থিতিটা বোঝাতে হবে। কখনও একা লাগলে ছবি একে সময় কাটাই, ওটা আমার কাছে মানসিক শান্তির জায়গা। আর যদি শারীরিকভাবে নিজেকে ঠিক রাখা যায় তা হলে মানসিকভাবেও ঠিক থাকা যায়। ১০ মিনিটের জন্য একটু যদি প্রকৃতির মাঝে হাঁটা যায় তা হলেই মন ভালো হয়ে যায়।’
সম্পর্ক নিয়ে অনেক ঝড় আপনাকে সামলাতে হয়েছে, কীভাবে কাটিয়েছেন সেসব সময়? নায়িকা থেরাপিতে খুব বিশ্বাসী। তার মতে, ‘আমার সেটা বলতে অসুবিধা হয় না। কারণ, এটা আমার কাছে ট্যাবু নয়। সব ধরনের পরিস্থিতি সামলাতে আমাকে থেরাপি খুবই সাহায্য করেছে। কিছু পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছি, কিছু সমস্যা সামলেছি, আবার নিজেকে শক্ত করে আমার মতো করে এগিয়েছি। আমি নিজেও এখন আর্ট থেরাপি শিখছি, যাতে আমিও অন্যদের সাহায্য করতে পারি।’
অনিন্দিতার কথায়, ‘জীবনের কঠিন পরিস্থিতি নানা সময়ে নানা শিক্ষা দিয়ে যায়, পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতাও দিয়ে যায়। আর আমি এখন যেমন, সেই অনিন্দিতাকেও আমিই গড়ে তুলেছি। তাই কোনও আক্ষেপ নেই। এখন আমি খুব খুশি, ব্যক্তিগতভাবে। সম্পর্ক ভাঙা এবং গড়া থেকেও নানা শিক্ষা হয়েছে। একটা সম্পর্কে যখন বিচ্ছেদ হয় আমরা স্বাভাবিকভাবেই অপর পক্ষকে দোষটা দিয়ে দিই। এক হাতে তো আর তালি বাজে না।’