বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এক নাম, এক বিদ্রোহ, এক উচ্চারণ—আজম খান। তাঁকে বলা হয় “পপগুরু”—কারণ তিনি শুধু গান করেননি, একটি নতুন সংগীতভাষার ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, যেখানে দেশীয় আবেগ মিশে গেছে রক-প্রাণিত শক্তিতে।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন সংগীতের ভাষা মূলত ধ্রুপদী ও আধুনিক গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তখন আজম খান নিয়ে এলেন এক ভিন্ন ধারা। গিটার হাতে তিনি তৈরি করলেন এমন এক সাউন্ডস্কেপ, যেখানে শহরের রাস্তাঘাট, তরুণদের বিক্ষোভ, প্রেম আর স্বাধীনতার স্বপ্ন একসঙ্গে ধ্বনিত হয়েছে।
‘উচ্চারণ’ ব্যান্ডের মাধ্যমে তিনি যে সংগীতযাত্রা শুরু করেন, তা পরবর্তীতে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর গান শুধু বিনোদন নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক ভাষ্য হয়ে উঠেছিল। “রেললাইনের বস্তিতে”, “আসি আসি বলে তুমি”, কিংবা “চারি দিকে রেললাইনের মতো” ধরনের গানগুলোতে তিনি নগরজীবনের বাস্তবতা ও অনুভূতিকে সহজ, সরাসরি এবং সুরেলা ভাষায় তুলে ধরেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা আজম খানের সংগীত ও ব্যক্তিত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তিনি যে সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠছিল, তার ভেতর থেকে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বিদ্রোহী কিন্তু মানবিক সংগীতধারা তৈরি করেন। সেই কারণেই তাঁকে কেবল সংগীতশিল্পী নয়, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।
আজম খানের গানে ছিল না অতিরঞ্জিত জটিলতা, ছিল না দূরত্ব—ছিল সরাসরি কথা, সহজ সুর, আর মানুষের অনুভব। এই সহজতার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর সংগীত প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে, এবং আজও বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ভাষা নির্মাণে তাঁর ছায়া স্পষ্ট।
তাঁর উত্তরাধিকার শুধু গানের ভাণ্ডারে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি তৈরি করে গেছেন এক সাংস্কৃতিক মানচিত্র, যেখানে বাংলা রক সংগীত নিজের পরিচয় খুঁজে পেয়েছে।
আজম খান চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর গিটার এখনো বাজে নতুন প্রজন্মের হাতে, নতুন ব্যান্ডের সাউন্ডে, আর শ্রোতার স্মৃতিতে। সেই কারণেই তিনি শুধু একজন শিল্পী নন—তিনি একটি সময়, একটি আন্দোলন, এবং বাংলা সংগীতের এক অনন্ত উচ্চারণ।
টিভি পর্দায় আজম খান স্মরণ
আজ পপগুরু আজম খান-এর ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে আগামীকাল বিশেষ আয়োজন প্রচার করবে চ্যানেল আই। ‘ট্রিবিউট টু গুরু আজম খান’ শিরোনামের এই অনুষ্ঠানে তাঁর স্মৃতিচারণা, জনপ্রিয় গান এবং সংগীতজীবনের নানা অজানা গল্প তুলে ধরবেন ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’-এর বর্তমান সদস্যরা।
অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হবে তাঁর একাধিক কালজয়ী গান। পাশাপাশি সদস্যরা শেয়ার করবেন ব্যান্ডের দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি ও আজম খানের সঙ্গে কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতা।
বিশেষ অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন অপু মাহফুজ এবং পরিচালনা করেছেন ইফতেখার মুনিম। এটি প্রচারিত হবে ৬ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চ্যানেল আইতে।
এছাড়া ৬ জুন দুপুর সাড়ে ১২টায় ‘তারকাকথন’-এ প্রচার হবে আরেকটি বিশেষ পর্ব, যেখানে অংশ নেবেন তাঁর কন্যা অরণী খান, ফুয়াদ নাসের বাবু এবং পার্থ মজুমদার। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করবেন ইফফাত আরা ইরা।
ঘুরে আসতে পারেন আজম খানের ইউটিউব চ্যানেলে