ঘটনার সূত্র ধরে শুক্রবার ও শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়টি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠলো। এ বারের কারণ, একটি ছবির প্রদর্শন। এ বারও গণ্ডগোল শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে সীমাবদ্ধ থাকল না, গভীর রাতেও পড়ুয়ারা রাজপথে নামলেন, যাদবপুর থানার সামনে বিক্ষোভ দেখালেন। আবার তার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একদল বহিরাগতের সঙ্গে পড়ুয়াদের হাতাহাতি চলল, ওই বহিরাগতদের চার জনের হাতে কয়েক জন ছাত্রীর শ্লীলতাহানি হয়েছে, এমন মারাত্মক অভিযোগও উঠল।
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল তথা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য কেশরীনাথ ত্রিপাঠী শনিবার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনার ক্ষেত্রে উৎকর্ষের কেন্দ্র ছিল। এখন তা অশান্তির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।’
বিশ্লেষণে জানা গেছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব অশান্তির সৃষ্টি হচ্ছে, সেগুলোর কোনওটার সঙ্গেই পড়াশোনার কোনও সম্পর্ক নেই।
আচার্য বলেছেন, ‘কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট চেয়েছি। এবার উচিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দেখা গেছে, ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের ভুল সিদ্ধান্তের ফলেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অশান্তির কেন্দ্র হয়ে উঠছে। কখনও উপাচার্য ঘেরাও তুলতে পুলিশ ডেকে পড়ুয়াদের লাঠিপেটা করাচ্ছেন, কখনও নিয়ম বহির্ভূতভাবে বহিরাগতদের প্রবেশ করতে ও বিশ্ববিদ্যালয় চৌহদ্দির মধ্যে অনুষ্ঠান করতে দিচ্ছেন। আর এ বার তো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি পর্যন্ত দিলেন বহিরাগতরা। এই বহিরাগতরা হলেন বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের কয়েকজন নেতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের একদল সদস্য। যারা কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, এমনকি প্রাক্তন ছাত্রও নন। এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে?
এ বারের ঘটনার সূত্রপাত ‘বুদ্ধ ইন অ্যা ট্রাফিক জ্যাম’ ছবিটির প্রদর্শন নিয়ে। ছবিটির পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী। যিনি একটু অন্য ধারার ছবি করার জন্য বলিউডে পরিচিত। আগামী শুক্রবার, ১৩ মে ছবিটি ভারতে মুক্তি পাওয়ার কথা। তবে তার আগেই ৬ মে ছবিটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হওয়ার কথা ছিল। যেমনটি হয়েছে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু যাদবপুরের ওই প্রেক্ষাগৃহটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দির মধ্যে অবস্থিত হলেও এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের একটি সংস্থা। সেটি প্রথমে ছবিটি প্রদর্শনের অনুমোদন দিলেও ৫ তারিখ হঠাৎই তা প্রত্যাহার করে নেয়। ওই দিন থেকেই উত্তাপ চড়তে থাকে। শেষমেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মাঠে রীতিমতো মঞ্চ তৈরি করে ছবিটি দেখানো হচ্ছিল।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুরঞ্জন দাস স্বীকার করে নিচ্ছেন, ‘থিঙ্ক ইন্ডিয়া’ নামে যে সংগঠন ওই ছবি প্রদর্শনের আয়োজক, তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও সম্পর্ক নেই, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড সংস্থা নয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড সংস্থা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অনুষ্ঠানের আয়োজন দূরের কথা, প্রবেশাধিকারই যে নেই, সেটাও সুরঞ্জন বাবু স্বীকার করছেন। তা হলে কীসের ভিত্তিতে ‘থিঙ্ক ইন্ডিয়া’ মঞ্চ বেঁধে ছবি দেখাচ্ছিল? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গোড়াতেই কেন বাধা দিল না? এর সদুত্তর উপাচার্য সুরঞ্জন দাসসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কারও কাছে নেই। তারা শুধু জানাচ্ছেন, ভবিষ্যতে এ রকম বরদাস্ত করা হবে না। তবে তার আগেই যা ক্ষতি হওয়ার তো হয়ে গিয়েছে!
ওই ছবি প্রদর্শন হচ্ছে দেখে পাল্টা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের একাংশের উদ্যোগে ‘মুজফফরনগর আভি বাকি হ্যায়’ নামে একটি তথ্যচিত্র দেখানো হতে থাকে, যার পরিচালক নকুল সিংহ সাহানি।
আরও পড়ুন: সড়ক দুর্ঘটনায় আফগানিস্তানে অন্তত ৫২ জন নিহত
উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগরে ২০১৩-তে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, সেটা নিয়েই এই তথ্যচিত্র, যেখানে দেখানো হয়েছে, রাজনৈতিক দলের নেতারা কীভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে হিংসায় উস্কানি দিচ্ছেন। প্রসঙ্গত, ওই দাঙ্গায় অভিযোগের আঙুল বিজেপির দিকে উঠেছিল।
কিন্তু ‘বুদ্ধ ইন আ ট্রাফিক জ্যাম’- এ সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এ সব নিয়ে কিছুই বলা নেই। সেখানে ভারতের মাওবাদীদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা এনজিও এবং শিক্ষা জগতের একাংশের অশুভ আঁতাতের বিষয়টি মূলত উঠে এসেছে। কাজেই, এর পাল্টা হিসেবে ‘মুজফফরনগর আভি বাকি হ্যায়’ প্রদর্শনের মধ্যে কোনও যুক্তি আপাত দৃষ্টিতে অন্তত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই ছবিকে বিজেপি বা আরএসএসের হাতিয়ার করারও কোনও অর্থ নেই।
রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বহুকাল ধরে মাওবাদীদের মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করছেন। আবার পড়ুয়াদেরও একটা অংশ মাওবাদীদের বিভিন্ন গণ সংগঠনের নেতা-নেত্রী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যে কলকাতা শহরে মাওবাদীদের অন্যতম আখড়া, সেটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গণ্ডগোলটা মনে হচ্ছে সেখানেই।’
/এজে/