অন্তিম শয়ানে মোহাম্মদ আলী

মোহাম্মদ আলীলাখো মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ায় পর অবশেষে অন্তিম শয্যায় শায়িত হলেন কিংবদন্তী বক্সার এবং সাংকৃতিক প্রতিরোধ আন্দোলনের জোরালো কণ্ঠস্বর মোহাম্মদ আলী। শুক্রবার নিজ জন্মশহর লুইসভিলের কেভ হিল সমাধিস্থলে তাকে পারিবারিকভাবে দাফন করা হয়েছে।
এর আগে আলীর মরদেহ নিয়ে একটি শোকযাত্রা বের হয়। যুদ্ধ ও আগ্রাসনবিরোধী, মানবতাবাদী এ বক্সিং কিংবদন্তিকে শেষ বিদায় জানাতে মানুষের ঢল নামে সেখানে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের শহর লুইসভিলেতে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার (১০ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টায়) তার মরদেহ বহন করে মোটর শোভাযাত্রা শুরু হয়। এই মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে মুহাম্মদ আলীর মরদেহ তার শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য এবং শেষ জীবনের স্মৃতিমাখা বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তার মরদেহবাহী মোটর শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার পর রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে ফুল বর্ষণ করতে থাকেন আগত তার ভক্ত-শুভানুধ্যায়ীরা।
আলীকে শেষ বিদায় জানাতে লাখো মানুষ ভিড় করেন রাস্তায়
পরে সব ধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে আলীর স্মরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬১ সালে লুইসভিলের যে জায়গায় আলী লড়াই করেছিলেন সে একই জায়গাতেই অনুষ্ঠিত হয়  তার স্মরণ অনুষ্ঠান। আলীর স্মরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বক্সার মাইক টাইসন, অভিনেতা উইল স্মিথ, কমেডিয়ান বিলি ক্রিস্টাল, সাংবাদিক ব্রায়ান্ট গামবেল প্রমুখ। এছাড়া তাকে শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে জড়ো হন মুসলিম নেতৃবৃন্দ। তাদের মধ্যে ছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান, জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ, সঙ্গীতশিল্পী ইউসুফ ইসলাম, বার্কলি মুসলিম লিবারেল আর্টস স্কুল ও জয়তুনা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা জায়েদ শাকির, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার মুসলিম স্কলার শারমেন জ্যাকসন প্রমুখ। 

স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন ১৫ হাজার মানুষ। অনুষ্ঠান চলার সময় তাদের মুখে ছিল ‘আলী, আলী’ স্লোগান।

সবশেষে আলীর মরদেহবাহী গাড়িবহর গিয়ে থামে কেভ হিল সমাধিতে। সেখানে এই মহাতারকার কফিন কাঁধে বহন করেন সাবেক হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন মাইক টাইসন, লেনক্স লুইস ও জনপ্রিয় হলিউড অভিনেতা উইল স্মিথ।এ কেভ হিল সমাধিতেই তাকে পারিবারিকভাবে দাফন করা হয়।

শুক্রবার আলীকে কেভ হিল সমাধিতে দাফন করা হয়
উল্লেখ্য, ১৯৬৪ সালে আলী ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। এরপরই ক্যাসিয়াস ক্লে নামটি পরিবর্তন করে হয়ে ওঠেন মোহাম্মদ আলী। শুরুতে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলন নেশন অব ইমলাম-এ যোগ দেন এবং পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। একইসঙ্গে একজন বক্সার ও বক্তা হিসেবে বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিমকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

৩ জুন ২০১৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্সের একটি হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলী। 

মোহাম্মদ আলীর দাফনে সব ধর্মের মানুষের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। কেননা মুসলমান আত্মপরিচয়ের প্রতি আলীর যে অঙ্গীকার ছিল, একই সেই অঙ্গীকার ছিল বিশ্বজনীন পরিচয়ের প্রতিও। নিজেকে বিশ্ব-নাগরিক ভাবতেন তিনি। দাফনেও তাই আলীর বৈশ্বিক পরিচয় এবং মুসলিম আত্মপরিচয়ের সম্মিলন ঘটছে। ইসলামের বিধান অনুযায়ীই সমাহিত হলেও তাতে দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে আসা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়।কিংবদন্তী এ বক্সারের একজন পারিবারিক মুখপাত্র জানান, মৃত্যুর কয়েক বছর আগে নিজের জানাজা ও দাফনের পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন মোহাম্মদ আলী নিজেই। দুইদিনব্যাপী শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের প্রথম দিনটিতে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার মুসলিম রীতিতে জানাজা পড়ানো হয়। আর দ্বিতীয় দিনের শোকযাত্রা আর স্মরণ অনুষ্ঠানটি ছিল বিশ্বজনীন। সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি

/এফইউ/