ফিলিপাইনে ‘মাদকবিরোধী রক্তাক্ত লড়াই’

‘বন্দুকভক্ত’ প্রেসিডেন্টের আদেশে ৩ মাসে ৭০০ মানুষ খুন

ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুয়ার্তে‘দ্য পানিশার’ খ্যাত রদ্রিগো দুয়ার্তের শাসনাধীন ফিলিপাইনে তিন মাসেরও কম সময়ে সাতশোরও বেশি মানুষ খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। একই অভিযোগ করেছে সেখানকার এক টেলিভিশন নেটওয়ার্কও। খুন হওয়া মানুষদের বেশিরভাগকেই মাদক-ব্যবহারকারী বলে সন্দেহ করা হচ্ছিলো। ‘বন্দুকভক্ত’ প্রেসিডেন্ট দুয়ার্তের দেওয়া আদেশ অনুযায়ীই পুলিশ ও নজরদারি বাহিনী তাদের হত্যা করেছে।
তিনশোটিরও বেশি মানবাধিকার ও সামাজিক আন্দোলনের সংগঠন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে এমন অভিযোগ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানোর জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আর দেশটির প্রভাবশালী একজন সিনেটর দুয়ার্তের কর্মকাণ্ডকে ‘রক্তাক্ত মাদকবিরোধী লড়াই’ আখ্যা দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়েই বন্দুকভক্তির জন্য ‘সুখ্যাতি’ রয়েছে দুয়ার্তের। গত মে মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার আগে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের কঠোর অবস্থানের কথা ব্যক্ত করে আসছিলেন ৭১ বছর বয়সী এ প্রেসিডেন্ট।

নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের প্রথম ভাষণে দুয়ার্তে জানান, ফিলিপাইনে আবারও সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থা চালু করা হবে। একইসঙ্গে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি এবং গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়ানো ব্যক্তিদের গুলি করার ক্ষমতা দেওয়া হবে নিরাপত্তা বাহিনীকে। আর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি কোনও মাদকসেবীকে চিনে থাকেন তবে তবে তাদেরকে নিজেরাই হত্যা করুন। তাদের বাবা-মাকে এ কাজটি করতে বলাটা বেশি কষ্টের।’ সবশেষ গত জুন মাসে তার বন্দুকপ্রীতির কবলে পড়েন সাংবাদিকেরা। ‘অপরাধী সাংবাদিক’দের গুলি করার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন ‘অপরাধী হলে আপনি সাংবাদিক বলেই এই হত্যাপ্রক্রিয়া থেকে রেহাই পাবেন না।’

মাদকবিরোধী অভিযানে নিহত স্বামীকে ধরে রেখেছেন স্ত্রী
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের বুধবারের প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর লেখা একটি চিঠিটি আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক কার্যালয় বরাবর জমা দেওয়া হয়েছে।

চিঠির সমন্বয়কারী ও ইন্টারন্যাশনাল ড্রাগ পলিসি কনসোর্টিয়াম (আইডিপিসি)-এর নির্বাহী পরিচালক অ্যান ফোর্ডহাম বলেন, ‘ফিলিপাইনের এ নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নিন্দা জানানোর জন্য জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাচ্ছি। মাদক নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের নির্বিচার হত্যার বৈধতা দেওয়া যায় না।’ এ ব্যাপারে নীরবতা ভাঙার জন্য জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যখন দিনের পর দিন লোকজনকে রাস্তায় হত্যা করা হচ্ছে তখন তাদের নীরবতা অগ্রহণযোগ্য।’

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী তিনশো সংগঠনের মধ্যে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, স্টপ এইডস এবং ইন্টারন্যাশনাল এইচআইভি/এইডস অ্যালায়েন্স-এর মতো সংগঠনগুলোও রয়েছে।

তাদের পরিসংখ্যান মিলে গেছে ফিলিপাইনভিত্তিক বাণিজ্যিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এবিএস সিবিএন নিউজ-এর সাংবাদিকদের সঙ্গে। ওই সাংবাদিকদের হিসেব অনুযায়ী, গত ১০ মে নির্বাচনি জরিপে দুয়ার্তেকে বিজয়ী ঘোষণা করার পর থেকে অন্তত ৭০৪ জনকে মাদক সংশ্লিষ্টতা থাকা সন্দেহে হত্যা করা হয়েছে।

ফিলিপাইনের প্রভাবশালী সিনেটর ও সাবেক আইনমন্ত্রী লিলা দে দিলমাও সিনেটে দেওয়া বক্তব্যে এসব হত্যার ঘটনায় তদন্ত শুরুর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা মাদকবিরোধিতার নামে রক্তাক্ত এই লড়াই চালাতে পারি না। মাদকবিরোধী অভিযানের কথা বলে পুলিশ একরকম নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

/এফইউ/বিএ/