‘খাশোগিকে পরিকল্পনা করেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুরস্কে পাঠানো হয়েছিল’

হত্যা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সৌদি কর্মকর্তারা সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুরস্ক পর্যন্ত নেওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। খাশোগিকে বলা হয়েছিল, তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তার বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজপত্র তুলতে পারবেন না। এর জন্য তাকে তুরস্কে সৌদি কনস্যুলেটে যেতে হবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খাশোগির এক বন্ধু এমন দাবি করেছেন। তার দাবি, অপহরণ কিংবা হত্যার পথ সহজ করতে তাকে তুরস্কে নেওয়ার এ পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

খাশোগি
তুর্কি বাগদত্তার সঙ্গে বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনতে গত ২ অক্টোবর ইস্তানবুলের সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করার পর নিখোঁজ হন ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার কলাম লেখক ও স্বেচ্ছানির্বাসিত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি। শুরুতে অস্বীকার করলেও ১৯ অক্টোবর সৌদি আরব জানায়, তুরস্কের ইস্তানবুল কনস্যুলেটে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে খাশোগির মৃত্যু হয়। এর দুদিন পরই খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে বলেও স্বীকার করেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে তাদের দাবি ছিল জিজ্ঞাসাবাদের সময় ভুলবশত তার মৃত্যু হয়েছে। তবে এরইমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষ এই হত্যাকাণ্ডকে পূর্বপরিকল্পিত বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

এবার কূটনৈতিক সূত্র ও খাশোগির এক বন্ধুকে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, হত্যা পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই খাশোগিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুরস্ক পর্যন্ত নিয়ে আসা হয়েছিল। কারণ, হত্যা পরিকল্পনায় যারা জড়িত, তাদের আশঙ্কা ছিল খাশোগিকে যুক্তরাষ্ট্রে হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হলে তা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে হলে এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিক্রিয়া হবে না বলে ধারণা করেছিল তারা।

খাশোগির সঙ্গে তার বাগদত্তা হাতিস চেঙ্গিসের বিয়ে তুরস্কেই হওয়ার কথা ছিল। এর জন্য খাশোগির পূর্ববর্তী বিবাহ বিচ্ছেদের কাগজপত্র প্রয়োজন ছিল। শুরুতে খাশোগিকে বলা হয়েছিল তিনি ওয়াশিংটনে অবস্থিত সৌদি দূতাবাস থেকে সেই কাগজপত্র তুলতে পারবেন। কিন্তু পরে তাকে ইস্তানবুলের সৌদি কনস্যুলেট থেকে কাগজপত্র তুলতে বলা হয়।

খাশোগির এক বন্ধু ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন: ‘জামাল খাশোগি ওয়াশিংটন ডিসি’র সৌদি দূতাবাসে বেশ কয়েকবার গিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, ওয়াশিংটন থেকেই বিবাহবিচ্ছেদের কাগজপত্র তুলতে পারবেন। আমি মনে করি তারা খাশোগিকে বলেছিল যে এটা সাধারণ বিষয়। কিন্তু পরে তারা তাকে ওই কাগজপত্র সংগ্রহের জন্য তুরস্ক যেতে বলে। ওয়াশিংটন ডিসি নাকি রিয়াদ তাকে তুরস্কে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। ওই সময়ে এটাকে কেবল আমলাতান্ত্রিক বিষয় মনে হয়েছিল। তবে যা কিছু ঘটেছে তারপর এখন নিশ্চিতভাবে সন্দেহ করার কারণ আছে।’

খাশোগির ওই বন্ধু আরও বলেন, ‘তারা ইস্তানবুলে যা করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রে করার সাহস পায়নি। তারা হয়তো মনে করেছিল, তারা যে পরিকল্পনা করেছে সেটি তুরস্কে বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। তাদের সে ধারণা ভেস্তে গেছে। তবে দায়ীদের আসলেই বিচারের মুখোমুখি করা হবে কিনা তা আমরা এখনও জানি না।’

খাশোগির বন্ধু তার নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়েছেন। তবে তিনি সৌদি আরবে বসবাস করেন বলে জানিয়েছে ইন্ডিপেনডেন্ট।

এর আগে সূত্রকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছিল, খাশোগিকে প্রলোভন দেখিয়ে সৌদি আরবে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছিল মার্কিন গোয়েন্দারা। খাশোগিকে সৌদি আরবে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য যারা প্রলোভন দেখিয়েছিলেন, তাদের একজন সৌদ আল কাহতানি। বেশ কিছু সূত্রকে উদ্ধৃত করে ইন্ডিপেনডেন্ট জানায়, বারবার খাশোগিকে কাহতানি নিশ্চিত করতে চাচ্ছিলেন যে তার (খাশোগির) দেশে ফেরা নিয়ে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। অভিযোগ রয়েছে, এ কাহতানিই স্কাইপের মাধ্যমে ইস্তানবুলস্থ সৌদি কনস্যুলেটে খাশোগিকে আটক, নির্যাতন ও হত্যার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সৌদি সরকারের দাবি, খাশোগি হত্যার ঘটনায় কাহতানি ও আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ১৮ জনকে।