সৌদি আরবে নারীদের অংশগ্রহণে নির্বাচন শুরু: ক্ষমতায়ন কতদূর

Saudi Women 2সৌদি আরবের ইতিহাসে শনিবার (১২ ডিসেম্বর) প্রথমবারের মতো একইসঙ্গে ভোটাধিকার প্রয়োগসহ নির্বাচনি লড়াইয়ে নামলেন দেশটির নারীরা।  স্থানীয় সময় সকাল আটটায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। চলবে বিকাল ৫টা পর্যন্ত।

প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহর ২০১১ সালে করা ডিক্রি অনুযায়ী প্রথমবারের মতো দেশের পৌর কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তারা। তবে, নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর পুরুষ আধিপত্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে টিকিয়ে রাখা দেশ সৌদি আরবে নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেলেও নির্বাচনি দৌড়ে আদৌ কি জয় পাবেন নারীরা? যেখানে প্রশাসনিক কাজকর্মেই নারীর ক্ষমতাকে সীমিত করে রাখা হয়েছে, সেখানে আদৌ কি নারীর প্রতিনিধিত্ব চাইবেন ভোটারা? সৌদি নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নারীর ভোটাধিকারের চেয়ে এখন তাই তাদের ক্ষমতায়নের প্রশ্নটিই অনেক বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে।

 

সৌদি আরবের পৌর নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে ভোটারদের মতামতকে অন্তর্ভুক্ত করে ফরাসি সংবাদমাধ্যম এএফপির করা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মধ্য-পশ্চিম এশিয়ার সংবাদবিষয়ক ব্রিটিশ ওয়েবসাইট মিডল ইস্ট আই। ওই প্রতিবেদনের আলোকে সৌদি নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্ব, সম্ভাবনা ও শঙ্কার জায়গাগুলো তুলে ধরা হলো।

 

নারী প্রার্থী বনাম সীমিত প্রশাসনিক ক্ষমতা

নারীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ ভোটকে রক্ষণশীল সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে বিবেচনা করা হলেও নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতা সীমিত থাকার কারণে তাদের নির্বাচিত করতে ইচ্ছুক নন ভোটাররা। নির্বাচনে জয়ী হলেও সরকারি বাগান, রাস্তাঘাট সম্পর্কিত কাজসহ বেশ কিছু কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই নারীদের। এছাড়া পুরুষ ভোটারের আধিক্যও নারী প্রার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছে সংবাদমাধ্যমটি।

 

শনিবারের নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব করছেন ৬ হাজার ১৪০ জন সৌদি নাগরিক। এরমধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৯৭৮ জন। আর পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা ৫,৯৩৮ জন। ২৮৪টি আসনবিশিষ্ট কাউন্সিলের দুই তৃতীয়াংশ আসন জনগণের নির্বাচিত প্রার্থীরা পূরণ করবেন। বাকি এক তৃতীয়াংশ আসন বাদশাহর নির্বাচিত সদস্যদের জন্য বরাদ্দ। নির্বাচনে ১ লাখ ৩৬ হাজার নারীসহ দেড় কোটি ভোটারের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে ২০০৫ ও ২০১১ সালে দুটি পৌর কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ওইসময় ভোটাধিকার কিংবা প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নারীদের ছিল না, ছিল কেবল সৌদি পুরুষদেরই।

 

সৌদি আরবের কুয়েতি সীমান্তের কাছে বসবাস উম মোহাম্মদের। ৪৭ বছর বয়সী এ নারী জানান, তার মেয়ে এক নারী প্রার্থীর হয়ে প্রচারণা চালালেও তিনি নিজে পুরুষ প্রার্থীকেই ভোট দেবেন। তার কারণ হিসেবে তিনি গোত্রের ক্ষমতার কথার উল্লেখ করেন। উমের মতে, যাকে নির্বাচিত করা হবে সে ব্যক্তিটি যদি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হন, তবে তিনি তার ক্ষমতা অনুযায়ী তাদের দেখভাল করতে পারবেন। সে কারণেই গোত্রের এক পুরুষ প্রার্থীকেই ভোট দেবেন বলে ভেবে রেখেছেন উম।

নারী ভোটারদের অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা

বছরের পর বছর ধরে রাজপরিবারের শাসনে থাকা দেশ সৌদি আরবের কোনও নির্বাচিত আইনসভা নেই। সৌদি আরবই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি নেই। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেন না সৌদি নারীরা।

নারীদের ভোটে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে ২০১১ সালে তখনকার সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ ডিক্রি জারি করেন। সৌদি রাজ্যের পার্লামেন্টের শুরা কাউন্সিলের ২০ শতাংশ সদস্য নারী হতে হবে বলেও নির্দেশ দেন তিনি।

 

তবে, শনিবার অনুষ্ঠিতব্য পৌর কাউন্সিল নির্বাচনে নারীরা অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও নানা সামাজিক বাধা ও পুরুষের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে তারা কতটুকু ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে মিডল ইস্ট আই।

সৌদি নারী উম মোহাম্মদ জানান, তার এলাকায় ট্যাক্সি নেই। নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি না থাকায় চাইলেও গাড়ি চালাতে পারবেন না।  তাই, স্বামী যদি তাকে নিয়ে যান, কিংবা এলাকার অন্য নারীরা যদি একসঙ্গে অন্য জায়গা থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে নিয়ে আসেন, তবেই তিনি ভোট দিতে যেতে পারবেন।

 

স্থানীয় ইসলামি চিন্তাবিদদের বাধা

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় চিন্তাবিদদের কাছ থেকে নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে নারী প্রার্থীদের। নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব করা নারীর জন্য নিষিদ্ধ বলে দাবি করছেন অনেক চিন্তাবিদ। আর সে কারণে চাপে পড়ে অনেক নারী প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তাই, চাইলেও পছন্দের নারী প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার সুযোগ পাচ্ছেন না বলে নাম প্রকাশ না করে অভিযোগ করেছেন এক ভোটার।

 

নারীদের নির্বাচিত করতে আগ্রহী নন পুরুষ ভোটাররা

হাফর আল বাতিন নামে এক পুরুষ ভোটারের অভিমত, পর্দাপ্রথার কারণে তারা নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না কিংবা তাদের মুখ দেখতে পারেন না। তাই ওই নারী প্রার্থী কেমন হতে পারেন, তা ভাবতে তাকে বাড়তি পরিশ্রম করতে হবে। সেক্ষেত্রে পুরুষ প্রার্থী বেছে নেওয়াকেই সহজ বলে মনে করছেন তিনি।

এদিকে, সৌদি আরবে নারীদের নিয়ে বিদ্যমান পরিস্থিতির মধ্যে পৌর নির্বাচনে আদৌ কোনও নারী জয়লাভ করবেন কিনা, সে ব্যাপারে সন্দেহ জানিয়েছেন এক পশ্চিমা কূটনীতিক। তবে কেউ হয়তো জয় পাবে এমন আশা এখনও জিইয়ে রেখেছেন তিনি।

 

জানেন হারবেন, তবুও জয়ী

সৌদি রাজকাঠামোর নানা কড়াকড়ি আর সীমিত ক্ষমতার মধ্যে নির্বাচনী দৌঁড়ে যে টেকা যাবে না, তা আগে থেকেই জেনে ফেলেছেন অনেক নারী প্রার্থী। এরপরও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগকেই বড় জয় বলে মনে করছেন তারা। এমন একজন নারী প্রার্থী অমল বাদরেলদিন। রিয়াদের মধ্যাঞ্চলে প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। বাদরেলদিন নিশ্চিত যে, তিনি নির্বাচনে জয়ী হচ্ছেন না। এরপরও প্রচারণায় যা পেয়েছেন, তাতেই সন্তুষ্ট তিনি।  বাদরেলদিন বলেন, ‘আমার যতটুকু সামর্থ্য ছিল, আমি চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি, নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব করার মধ্য দিয়েই আমার জয় হয়েছে।’

 

সত্যিকার অর্থেই হয়তো বাদরেলদিন তার চ্যালেঞ্জে জয়ী। কারণ সব নারী প্রার্থীর তার মতো সৌভাগ্য হয়নি। চেয়েও অনেক নারী প্রার্থী হতে পারেননি। আবার চাপের মুখে অনেক নারীকেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিতে হয়েছে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই, বিবিসি, আল জাজিরা

 

/এফইউ/বিএ/