মার্কিন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কমলা হ্যারিস প্রথমবারের মতো ফিলাডেলফিয়া অঙ্গরাজ্যে বিতর্কের মঞ্চে উপনীত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সময় মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) প্রায় ৯০ মিনিট ধরে চলা এই বিতর্কে হ্যারিসের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের সামনে ট্রাম্পকে রক্ষণাত্মক অবস্থান নিতে দেখা গেছে।
বিতর্কের বড় অংশ জুড়েই ট্রাম্পের পূর্বের কৃতকর্মের জন্য তাকে কটাক্ষ করে গেছেন হ্যারিস।
এক পর্যায়ে হ্যারিস বলেছেন, অভিবাসন নিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে মানুষের উচিত ট্রাম্পের সমাবেশে যোগ দেওয়া। কারণ তার বাগাড়ম্বরে ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে মানুষ সভাস্থল ত্যাগ করতে শুরু করে।
এ কথায় দৃশ্যতই থতমত খেয়ে যান সাবেক প্রেসিডেন্ট। বিশাল জনসভা ও প্রতিপক্ষকে তাচ্ছিল্য করে কথা বলা- ট্রাম্পের মূল দুটো কৌশলই হ্যারিসের সামনে কার্যত ব্যর্থ হতে দেখা যায়। এরপরই তিনি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে কোনও প্রমাণ ছাড়া দাবি করেন, হাইতির অভিবাসীরা ওহাইও অঙ্গরাজ্যে বসবাসকারীদের পোষা প্রাণী খেয়ে ফেলছে।
ট্রাম্পকে রক্ষণভাগে ঠেলে দেওয়ার একটিমাত্র খণ্ডচিত্র ছিল এটি। নিজের সক্ষমতা তুলে ধরা ও দুর্বলতা লুকিয়ে রাখা এবং প্রতিপক্ষের চিরাচরিত কৌশল ব্যর্থ করে দেওয়া যদি সফলতা নির্ধারণ করে, তবে ভাইস প্রেসিডেন্টের দিকেই বুধবার বিতর্কের পাল্লা ভারী ছিল বলা যায়।
বিতর্কের শুরু থেকেই অর্থনীতি ও গর্ভপাতের অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সাবেক প্রেসিডেন্টকে কোণঠাসা করে রাখতে দেখা যায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে।
অর্থনীতির বেহাল অবস্থার জন্য বাইডেন প্রশাসনের ওপর এমনিতেই হতাশ মার্কিনিরা। তবে এক্ষেত্রেও ট্রাম্পের কোর্টে বল ঠেলে দিয়েছেন হ্যারিস। ট্রাম্পের চড়া আমদানি শুল্কের পরিকল্পনাকে ‘ট্রাম্প সেলস ট্যাক্স’ নাম দিয়ে তিনি এর কঠোর সমালোচনা করেন।
এই অভিযোগে আত্মপক্ষ সমর্থন করে ট্রাম্প দাবি করেন, তার প্রশাসন চীনের ওপর শুল্ক আরোপ করে দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার এনেছিল। তার দাবিতে খাদ না থাকলেও, দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে হ্যারিসের ওপর চড়াও হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেন তিনি।
গর্ভপাতের অধিকার সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা নিয়েও অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যায় সাবেক প্রেসিডেন্টকে। নিজের বক্তব্য পরিষ্কার করার বদলে অসংলগ্ন কথা বলে গেছেন তিনি। ট্রাম্প দাবি করেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিনি এই ইস্যুতে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অবশ্য কোনও জরিপ তার এই বক্তব্যকে সমর্থন করে না।
তার এই ভুলের সুযোগ নিয়েছেন হ্যারিস। জন্মদান সংক্রান্ত জটিলতা ও গর্ভপাত সেবা বঞ্চিত ভুক্তভোগী সমস্ত পরিবারের প্রতি এক আবেগঘন বক্তব্য দেন তিনি। এই আইনকে ‘ট্রাম্প অ্যাবরশন ব্যানস’ উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের জন্য এই আইন (গর্ভপাতে নিষেধাজ্ঞা) অত্যন্ত অবমাননাকর।’
ট্রাম্পের চেয়ে জরিপে এগিয়ে থাকা অঞ্চলে অত্যন্ত সুচিন্তিত ছিল ভাইস প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য।
সময় গড়ানোর সঙ্গে ট্রাম্পকে বিভিন্নভাবে নাস্তানাবুদ করতেই থাকেন হ্যারিস। এগুলো উপেক্ষা করা সম্ভব হলেও প্রতিটি বিষয়ে উত্তর দিতে গিয়ে আরও ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন ট্রাম্প।
বিতর্কের এক পর্যায়ে জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলনের বিতর্কিত পদ্ধতি ‘অয়েল শেল ফ্রাকিং’ সামনে আসে। ২০১৯ সালে হ্যারিসের নির্বাচনী প্রচারণার অংশ ছিল এটি। পরবর্তীতে এই ইস্যুতে তিনি নিজের অবস্থান বদল করেন। এসময় হওয়া তার আর্থিক ক্ষতি সামলাতে নিজের ধনী বাবার কাছে হাত পাতেননি বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন কমলা হ্যারিস। শেষ মন্তব্যটি স্পষ্টতই ট্রাম্পকে প্ররোচিত করতেই বলা হয়।
এবারও টোপ গিলতে দেখা যায় ট্রাম্পকে। হ্যারিসের ভুলভাল নীতি গ্রহণের সমালোচনা না করে তিনি বলেন, প্রয়োজনের সময় নিজের বাবার কাছ থেকে ‘সামান্য’ আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করেছিলেন।
বাইডেন প্রশাসনকে আফগানিস্তান ইস্যুতেও আক্রমণ করার সুযোগ হাতছাড়া করেন ট্রাম্প। তিনি সুযোগ পাওয়ার আগেই আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে এই ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতা তুলে ধরেন হ্যারিস। তিনি বলেছেন, তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সমঝোতাই যুক্তরাষ্ট্রের আফগান ব্যর্থতার সূত্রপাত।
পুরো বিতর্ক জুড়েই একই ঘটনা বারবার দেখা গেছে- হ্যারিস একের পর এক টোপ ছাড়ছেন, আর প্রতিপক্ষকে তুলোধুনো করতে ব্যগ্র ট্রাম্প প্রতি পদে ভুল করছেন।
রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে বিতর্কের আয়োজক প্রতিষ্ঠান এবিসি নিউজের সমালোচনা করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, আয়োজকরা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন।
কিন্তু দিনশেষে, ট্রাম্পের নিজের বক্তব্য ও ব্যগ্রতা এবং হ্যারিসের ধীরস্থির ও সুচিন্তিত মন্তব্য এই বিতর্কের গতিপথ নির্ধারণ করেছে। ট্রাম্পের প্রতিটি দাবিকেই হ্যারিস সুকৌশলে তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে গেছেন।
প্রথম বিতর্ক শেষ হতেই ৫ নভেম্বরের আগে আরেকটা ‘প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেট’ আয়োজনের আহ্বান করেছে ডেমোক্র্যাট পার্টি।
এ থেকেই বোঝা যায়, মঙ্গলবারের বিতর্কে হ্যারিসের সাফল্য নিয়ে ডেমোক্র্যাট পার্টি কতটা আত্মবিশ্বাসী।
তথ্যসূত্র: বিবিসি