যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ঐতিহাসিক চুক্তি চূড়ান্ত

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে যুদ্ধ বন্ধ করতে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নিজ নিজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই শান্তি আলোচনায় পাকিস্তান অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। খবর রয়টার্স। 

ওয়াশিংটন সময় রবিবার (১৪ জুন) বিকাল সাড়ে ৫টায় নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণ।” এর কিছুক্ষণ আগেই পাকিস্তানের স্থানীয় সময় সোমবার ভোরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এই সফল চুক্তির কথা প্রথম প্রকাশ করেন। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।

চুক্তিতে যা থাকছে 

চুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ শর্তগুলো এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা না হলেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, এই চুক্তির মূল শর্ত হলো— লেবাননসহ সমস্ত ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সব ধরণের সামরিক অভিযান বন্ধ করা। 

অপরদিকে ট্রাম্প তার পোস্টে জানিয়েছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’— যা ইরান গত কয়েক মাস ধরে কার্যত বন্ধ করে রেখেছিল, তা এখন থেকে সম্পূর্ণ ‘টোল-মুক্ত’ বা বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এর বিনিময়ে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর জারি করা দীর্ঘ অবরোধের অবসান ঘটবে। ট্রাম্প কিছুটা নাটকীয় ভঙ্গিতে লেখেন, “বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেল সরবরাহ সচল হতে দাও!” 

এর আগে কূটনৈতিক সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছিল, প্রাথমিক এই চুক্তির ফলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়বে, হরমুজ প্রণালি খুলবে এবং মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার হবে। তবে ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর মূল কারণ— ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত জটিল বিষয়টি আগামী ৬০ দিনের একটি বিশেষ বর্ধিত আলোচনা পর্বে সমাধান করা হবে। 

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও লেবাননে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর প্রথম হামলার পর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যার বড় অংশই ইরান ও লেবাননের বেসামরিক নাগরিক। পাল্টা জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম ইলেকশন) অনুষ্ঠিত হবে, যা দেশটির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে। নির্বাচনের আগে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং এই ব্যয়বহুল যুদ্ধের কারণে সাধারণ মার্কিনিদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেওয়ায় এই যুদ্ধ ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি ও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 

চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার ইসরায়েলি চেষ্টা? 

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রবিবার বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলীতে ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলার পরও এই চুক্তিটি আলোর মুখ দেখেছে। ইসরায়েলের এই হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়ই। 

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক্স-এ এক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বৈরুতে ইসরায়েলের এই হামলা প্রমাণ করে যে নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার মতো ‘সদিচ্ছা ও ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই’। 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরু থেকেই এই চুক্তির বিরোধিতা করে আসছিলেন এবং লেবাননে সামরিক তৎপরতা কমাতে ট্রাম্পের অনুরোধ উপেক্ষা করেছেন। ফক্স নিউজ এক অজ্ঞাতনামা কূটনীতিকের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইসরায়েলের এই সাম্প্রতিক হামলা মূলত মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তিকে নস্যাৎ বা সাবোটাজ করার একটি অপচেষ্টা ছিল। তবে ইসরায়েল এই চুক্তিকে নিজেদের জন্য বাধ্যতামূলক নয় বলে ঘোষণা করেছে এবং লেবাননে তাদের সামরিক স্বাধীনতা বজায় রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।