অভিশপ্ত নাকি নিছক কাকতাল? কোহিনূরের চেয়েও ভয়ঙ্কর হীরার ইতিহাস জানলে চমকে যাবেন

অভিশপ্ত রত্নপাথরের গল্প ইতিহাসে নতুন নয়, তবে ‘হোপ ডায়মন্ড’-এর মতো এত অন্ধকার ও ভয়াল ইতিহাস আর কোনও রত্নের ভাগ্যে জোটেনি। ৪৫ ক্যারেটেরও বেশি ওজনের এই গাঢ় নীল রঙের হীরাটিকে বলা হয় ‘বিশ্বের সবচেয়ে অভিশপ্ত হীরা’। কারণ, এর পেছনে লুকিয়ে আছে একের পর এক দুর্যোগ, দেউলিয়াপনা ও মৃত্যুর দীর্ঘ ইতিহাস। বর্তমানে এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে সংরক্ষিত থাকলেও, এই অভিশপ্ত হীরার মূল উৎপত্তি ভারতে।

 

হোপ ডায়মন্ডের লিখিত ইতিহাস শুরু হয় ১৬৬৬ সালে, যখন ফরাসি ভ্রমণকারী ও রত্ন ব্যবসায়ী জাঁ-ব্যাপটিস্ট তাভেরনিয়ে ভারতে এটি ক্রয় করেন। পরে ১৬৬৮ সালে তিনি এটি ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের কাছে বিক্রি করে দেন। স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামের তথ্যমতে, সে সময় ভারতই ছিল হীরার একমাত্র বাণিজ্যিক উৎস এবং হীরাটি ভারতের গোলকোণ্ডা অঞ্চলের কোল্লুর খনি থেকে সংগৃহীত হয়েছিল।

তবে এই হীরার প্রকৃত উৎপত্তি ঘিরে ছড়িয়ে আছে এক রোমাঞ্চকর রহস্য। একটি প্রচলিত উপকথা অনুযায়ী, আদিতে ১১১ ক্যারেটের এই নীল হীরাটি ভারতের একটি মন্দির থেকে চুরি করা হয়েছিল, যা হিন্দু দেবী সীতাদেবীর মূর্তির চোখ হিসেবে বসানো ছিল। চুরির ঘটনা জানতে পেরে ক্রুদ্ধ গ্রামবাসীরা শাপ দেয়, যিনিই এই হীরার মালিক হবেন, তার জীবনে নেমে আসবে ঘোর বিপর্যয়। যদিও এই কাহিনীর পক্ষে কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবে রত্নটির ওপর চেপে বসা অভিশাপের তকমাটিকে তা আরও জোরালো করেছে।

পরবর্তীতে চতুর্দশ লুইয়ের জন্য তাভেরনিয়ের মূল ১১১ ক্যারেটের হীরাটি কেটে প্রায় ৬৯ ক্যারেটের ‘ফ্রেঞ্চ ব্লু’ তৈরি করা হয়। ফরাসি বিপ্লবের অরাজকতার সময় ১৭৯২ সালে রাজকীয় সংগ্রহশালা থেকে এটি চুরি হয়ে যায়। প্রায় দুই দশক গায়েব থাকার পর ১৮১২ সালে লন্ডনে হুবহু একই বৈশিষ্ট্যের একটি নীল হীরা দৃশ্যমান হয়। গবেষকদের মতে, চুরি হওয়া ফ্রেঞ্চ ব্লুকে আবার কেটে আধুনিক হোপ ডায়মন্ডে রূপ দেওয়া হয়েছিল। ১৮৩৯ সালে ‘হোপ’ ব্যাংকিং পরিবারের এক রত্ন ক্যাটালগে ৪৫.৫ ক্যারেটের এই নীল হীরার উল্লেখ মেলে এবং সেখান থেকেই এর নাম হয় ‘হোপ ডায়মন্ড’।

অভিশপ্ত রত্ন বললেই অনেক ভারতীয়র মনে কোহিনূরের কথা আসে, কিন্তু মালিকদের ধ্বংস করার ক্ষেত্রে কোহিনূরও হোপ ডায়মন্ডের সমকক্ষ নয়। ১৯১১ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, শতবর্ষ আগে ভারত থেকে খনন করে আনা হোপ ডায়মন্ডের চেয়ে বেশি অশুভ ইতিহাস সম্ভবত আর কোনও রত্নের নেই। এটি এর মালিকদের জন্য বিভিন্ন সময়ে মৃত্যু, বিপর্যয়, অপমান ও চরম দারিদ্র্য বয়ে এনেছে।

আমেরিকার ধনকুবের ঐশ্বর্যময়ী এভলিন ওয়ালশ ম্যাকলিনের প্রায়ই হীরাটি পরতেন

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, হোপ ব্যাংকিং পরিবারের লর্ড হেনরি ফ্রান্সিস হোফ ও তার স্ত্রী মে ইয়োহে চরম অর্থকষ্টে পড়ে ১৯০২ সালে বিচ্ছেদ ঘটান। সর্বস্ব হারিয়ে লর্ড হেনরি হীরাটি সাইমন ফ্রাঙ্কেল নামের এক জহুরির কাছে বিক্রি করেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রাঙ্কেল থেকে হীরাটি কেনা জাক কোলে পরবর্তীতে আত্মহত্যা করেন। এরপর এটি যায় রুশ যুবরাজ ইভান কানিটোভস্কির হাতে, যিনি হীরাটি কেনার কিছুদিনের মধ্যেই রুশ বিপ্লবীদের হাতে খুন হন। এছাড়া, প্যারিসের নৃত্যশিল্পী লরেন্স লাডু এই হীরাটি পাওয়ার পর ঈর্ষান্বিত প্রেমিকের হাতে নিহত হন। এমনকি হীরাটির মালিক গ্রিক ব্যবসায়ী সাইমন মানচারাইডেস ১৯১০ সালে এটি বিক্রি করার পর সপরিবারে গাড়ি দুর্ঘটনায় পাহাড়ি খাদে পড়ে মারা যান।

হীরাটির এই ভয়ঙ্কর দুর্নামকে বিক্রির কৌশল বানিয়েছিলেন ফরাসি রত্ন ব্যবসায়ী পিয়েরে কার্টিয়ার। আমেরিকার ধনকুবের ঐশ্বর্যময়ী এভলিন ওয়ালশ ম্যাকলিনের কাছে হীরাটি বিক্রির জন্য কার্টিয়ার চুরির গল্প ও অভিশাপের ইতিহাসকে আরও রঙিন ও নাটকীয় করে তোলেন। ১৯১১ সালে এভলিন হীরাটি কিনে নেন। তবে এটি কেনার পর তার নয় বছরের ছেলে দুর্ঘটনায় মারা যায়, স্বামী অন্য নারীর জন্য তাকে ছেড়ে যান, মেয়ে মারা যান অতিরিক্ত ওষুধ সেবনে এবং চরম দেনায় ডুবে তিনি তার সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট বিক্রি করতে বাধ্য হন।

১৯৪৭ সালে এভলিনের মৃত্যুর পর জহুরি হ্যারি উইনস্টন তার রত্ন সংগ্রহ কিনে নেন এবং ১৯৫৮ সালে হীরাটি স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামে দান করেন। অবশ্য স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ এই অশুভ দুর্ঘটনার তালিকাগুলোকে অনেকটাই অতিরঞ্জিত ও ঐতিহাসিক তথ্যের ঘাটতিযুক্ত বলে মনে করে। তথ্যভিত্তিক প্রমাণ যাই থাক না কেন, মৃত্যুর মিছিলে ভরা হোপ ডায়মন্ড আজও বিশ্বের ইতিহাসের এক রহস্যময় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

 
 
 
 
 
View this post on Instagram
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

A post shared by Grant Mobley (@thegrantmobley)

 

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস