পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির পুরনো ধারণা কি তবে ভুল?

বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে ধূমকেতুর আঘাতেই পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা হয়েছিল, বিজ্ঞানীদের দশকের পর দশক ধরে চলা এই জনপ্রিয় ধারণাটি ভুল হতে পারে। নতুন এক কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গেছে, ধূমকেতুতে থাকা প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভঙ্গুর জৈব অণুগুলো তীব্র সংঘর্ষের সময় ধ্বংস হয়ে যেত।

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমির গবেষক রিচার্ড আনস্লোর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণার তথ্য বুধবার সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় বলা হয়, ৪ বিলিয়ন বছরেরও বেশি আগে আদি পৃথিবীতে ১০০ মিটারের চেয়ে বড় ১ লাখেরও বেশি ধূমকেতু আঘাত হেনেছিল। কিন্তু এসব সংঘর্ষ এতটাই তীব্র ছিল যে প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় অণুগুলো টিকে থাকতে পারেনি।

১০ হাজার বার আদি পৃথিবীর পরিবেশ সিমুলেশন করে গবেষক দল দেখেছে, গড়ে কোনও সফল সংঘর্ষের ঘটনা মেলেনি। রিচার্ড আনস্লো বলেন, পৃথিবীতে আঘাতের সময় এই ধূমকেতুগুলোর গতিবেগ এত বেশি ছিল যে, খুব কম বা বলতে গেলে কোনও ধূমকেতুই অক্ষত জৈব অণু সরবরাহ করতে পারত না। ফলে আগে যেমনটা ভাবা হতো, ধূমকেতু আসলে প্রাক-জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য ততটা কার্যকর বলে মনে হচ্ছে না।

গবেষণায় প্রধানত হাইড্রোজেন সায়ানাইড অণুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা অ্যামিনো এসিড তৈরিতে সাহায্য করে। বিখ্যাত হ্যালির ধূমকেতু ও হেল-বপ ধূমকেতুতেও এই উপাদান পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু অত্যধিক তাপ ও চাপের কারণে সংঘর্ষের সময় এসব অণু ধ্বংস হয়ে যায়।

তবে ধূমকেতু ব্যর্থ হলেও বিজ্ঞানীরা অন্য দুটি বিকল্পের কথা ভাবছেন। প্রথমত, আদি পৃথিবীর নিজস্ব পরিবেশেই হয়তো এসব অণু তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, গ্রহাণু কম গতিতে পৃথিবীতে আঘাত করায় তা প্রাণের রাসায়নিক উপাদান সরবরাহে সফল হতে পারে। সাম্প্রতিক ‘বেনু’ ও ‘রিউগু’ গ্রহাণুর নমুনায় প্রোটিন তৈরির অ্যামিনো এসিড পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া গবেষণায় উঠে এসেছে আরেকটি চাঞ্চল্যকর সম্ভাবনা। কেমব্রিজের গবেষক আনস্লো জানান, কম ভর ও সূর্য থেকে দূরে থাকার কারণে মঙ্গল গ্রহে ধূমকেতুর আঘাতের গতি কম ছিল। ফলে পৃথিবীতে হাইড্রোজেন সায়ানাইড ধ্বংস হলেও মঙ্গলে হয়তো তা টিকে গিয়ে থাকতে পারে, যা লাল গ্রহে একসময় প্রাণ থাকার তত্ত্বকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।

তবে লন্ডনের রয়াল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কুইনি চ্যান এই তত্ত্বকে এখনই পুরোপুরি খারিজ করতে রাজি নন। তার মতে, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগেই এসব উপাদান অন্য বিক্রিয়ায় টিকে থাকার মতো জৈব যৌগে রূপ নিতে পারে। একই মতামত ব্যক্ত করে অ্যালবিয়ন কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক নিকোল জেলনার বলেন, ধূমকেতুর ভূমিকা পুরোপুরি বাদ দেওয়া না গেলেও গবেষকেরা একটি যুক্তিযুক্ত সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

সূত্র: সিএনএন