বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক এখন এমন এক ‘আর্থিক অমরত্বে’র দ্বারপ্রান্তে, যেখানে তিনি হতে যাচ্ছেন ইতিহাসের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার (লাখ কোটি পতি)। তিনি এমন এক করপোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন যা বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য এতটাই অপরিহার্য যে এর পতন অসম্ভব। আর ঠিক এই সময়েই, স্পেসএক্স-এর ঐতিহাসিক ও দানবীয় আইপিও ছাড়ার আগের রাতেও মাস্ক তার নিজস্ব ডিজিটাল রাজত্বে (এক্স) বসে কট্টর ডানপন্থি সংস্কৃতি যুদ্ধ উসকে দিতে ব্যস্ত ছিলেন। আধুনিক করপোরেট ইতিহাসে এমন দায়মুক্তির ঘটনা আর কারও ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।
ইলন মাস্কের বছরের পর বছর ধরে চলা ধারাবাহিক বিতর্ক এবং শ্বেতাঙ্গ পরিচয়বাদী রাজনীতির প্রকাশ্য সমর্থন বিনিয়োগকারীদের এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে যেখানে অন্য কোনও সিইও হলে চাকরি হারাতেন, কিন্তু মাস্কের ক্ষেত্রে তা খাটছে না। মাস্ক যা-ই বলুন বা করুন না কেন, তার ভবিষ্যৎ সাম্রাজ্যের অংশীদার হতে ওয়াল স্ট্রিটের ক্ষুধার্তদের ক্ষুধা কমছে না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্পেসএক্সের ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের আইপিও, যেখানে শুক্রবারের ঐতিহাসিক বাজার অভিষেকের আগেই শেয়ারের চাহিদা জোগানের তুলনায় অনেক ছাড়িয়ে গেছে।
বেলফাস্টের দাঙ্গা ও মাস্কের উসকানি
মঙ্গলবার রাতে সুদানি এক অভিবাসীর ছুরিকাঘাতে এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার গ্রাফিক ভিডিও এক্স প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে অভিবাসী-বিরোধী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। মুখোশধারী জনতা গাড়ি, সিটি বাস এবং বেশ কিছু বাড়িতে আগুন দেয় এবং ‘বিদেশিরা দূর হও’ স্লোগান দিয়ে মিছিল করে, যার ফলে সংখ্যালঘু পরিবারগুলো পুলিশের সুরক্ষায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
অভিবাসীদের সহিংসতার বিষয়ে প্রায় প্রতিদিন পোস্ট করা মাস্ক, ব্রিটিশ কট্টর ডানপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট টমি রবিনসনের একটি পোস্ট শেয়ার করেন, যেখানে ‘আমাদের মানুষের ওপর আরেকটি আক্রমণ’-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার স্থানগুলোর তালিকা ছিল। মাস্ক তার ২৪ কোটি অনুসারীর উদ্দেশে ঘোষণা করেন, ‘বারবার এবং উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করলেই কেবল পরিবর্তন আসবে!’ তার এই মন্তব্যকে যুক্তরাজ্যের নেতারা দাঙ্গায় উসকানি হিসেবে দেখছেন।
বেলফাস্টের এই ঘটনায় মাস্কের জড়িয়ে পড়ার আগে তিনি হেনরি নোয়াক নামের এক শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ কিশোর হত্যাকাণ্ডের দিকে কয়েক সপ্তাহ ধরে মনোযোগ দিয়েছিলেন। এক ব্রিটিশ শিখ ব্যক্তির হাতে ওই কিশোর খুন হওয়ার পর ‘শ্বেতাঙ্গ-বিরোধী’ পুলিশিংয়ের দাবিতে কট্টর ডানপন্থিরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। মাস্কের এই অভিবাসী-বিরোধী সক্রিয়তা সমগ্র পশ্চিমা দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অভিজাতরা ইচ্ছাকৃতভাবে শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যাকে জনসংখ্যাগতভাবে মুছে ফেলার ছক কষছে, যা ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ তত্ত্ব নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রেও মাস্ক নাগরিক নন এমন ভোটার জালিয়াতির দিকে নিরলসভাবে মনোযোগ দিয়ে দাবি করছেন যে, ডেমোক্র্যাটরা স্থায়ী একদলীয় রাষ্ট্র গঠনের জন্য অবৈধ অভিবাসীদের ভোট সংগ্রহ করছে। এমনকি ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র প্রাইমারিতে ডেমোক্র্যাটরা ব্যাপক জালিয়াতি করেছে বলেও কোনও প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্পপন্থিদের (এমএজিএ) সঙ্গে সুর মেলান তিনি।
সভ্যতার পতন বনাম মাস্কের দর্শন
মাস্কের বিশ্বদর্শন একটি একক এবং বিপর্যয়কর ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। আর তা হলো পশ্চিমা সভ্যতা বা শ্বেতাঙ্গ সংস্কৃতি গণ-অভিবাসন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং ‘ওক’ প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। এই নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মতো বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছে। স্টারমার এই টেক বিলিয়নেয়ারের বিরুদ্ধে তার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ‘বিভাজন তৈরি’ এবং বিদেশি গণতন্ত্রে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ এনেছেন। জবাবে বুধবার মাস্ক পোস্ট করেন, ‘অভিবাসীদের নৃশংসভাবে নিরীহ মানুষকে হত্যা করাই মানুষকে রাগান্বিত করছে, সোশ্যাল মিডিয়া নয়!’ তবে মাস্ক তার বক্তব্যকে বর্ণবাদী বা বিদেশি-বিদ্বেষী বলতে নারাজ; তার মতে, অভিবাসন ও অপরাধ নিয়ে বিতর্ক বন্ধ করার জন্যই এই অভিযোগগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এক দশক আগে কোনও সিইও দেশে বা বিদেশে শ্বেতাঙ্গ-পরিচয়বাদী আতঙ্ক ছড়ালে করপোরেট বোর্ডে সংকট তৈরি হতো এবং বিনিয়োগকারীরা বিদ্রোহ করতেন। কিন্তু মাস্ক নিজের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন প্রকাশ্যে এটি করছেন। তার কোম্পানিগুলো এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে উঠেছে। স্পেসএক্সের বিশাল মূল্যায়নের কারণে এটি যদি শেষ পর্যন্ত এসঅ্যান্ডপি ৫০০সূচকে জায়গা করে নেয়, তবে সাধারণ আমেরিকানরা যারা সাধারণ ইনডেক্স ফান্ড বা রিটায়ারমেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন, তারা পছন্দ করুন বা না করুন, মাস্কের সাম্রাজ্যের অংশীদার হয়ে যাবেন।
বুধবার মাস্কের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ হয়েও কেন তিনি সমুদ্র সৈকতে বিলিয়ন ডলার উপভোগ না করে দিনের পর দিন একটি তিক্ত অনলাইন সংস্কৃতি যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছেন? জবাবে মাস্ক পোস্ট করেন, ‘সভ্যতার পতন ঘটলে অন্য কিছুরই আর কোনও মূল্য থাকবে না।’
সূত্র: অ্যাক্সিওস