স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে উপস্থিত যে কারও বিষয়টি চোখে পড়বে। আর যারা টিভিতে খেলা দেখেন, তবে তাদের কানে আসবেই। আর্জেন্টিনার ফুটবল ম্যাচের চিরচেনা আবহসংগীত এটি। বিশ্বকাপ, দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলের বাছাইপর্ব, কোপা আমেরিকা কিংবা প্রীতি ম্যাচ; প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, আর্জেন্টিনার সমর্থকরা যেখানেই যান, এই সুর সেখানে থাকবেই।
স্টেডিয়ামে লাফাতে লাফাতে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে আলবিসেলেস্তে সমর্থকেরা গাইতে থাকেন, ‘ই ইয়া লো ভে, ই ইয়া লো ভে, এল কে নো সালতা, এস উন ইংলেস!’ যার অর্থ হলো, ‘এবং এখন তোমরা দেখছ, এখন তোমরা দেখছ, যে লাফাবে না সেই ইংরেজ!’
এই স্লোগানটি আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যে, প্রতিটি বিশ্বকাপ জয়ের পর খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানাতেও এটি ব্যবহার করা হয়। খেলোয়াড়েরা নিজেরাও লাফিয়ে লাফিয়ে ভক্তদের সঙ্গে সুর মেলান। শনিবার অতিরিক্ত সময়ে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল জয়ের পর, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা তাদের ক্লান্ত শরীরে শেষবারের মতো শক্তির সঞ্চার করে এই স্লোগান গেয়ে লাফাতে থাকেন। এমনকি ভক্তরা যখন তাদের গান বাজনার তালিকায় আর্জেন্টিনার লোকসংগীত ‘হই আকা এন এল বাইলে’ (আজ এখানে নাচে) যুক্ত করে, তখনও তারা গানের রূপান্তরিত লিরিকের শেষে গিয়ে লাফাতে শুরু করে, কারণ তারা ইংরেজ নয়।
বুধবারের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল ম্যাচটি হতে যাচ্ছে ১৯৮৬ সালের পর কোনও প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে আর্জেন্টিনার ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার মাত্র তৃতীয় ঘটনা। এর আগে ২০০৫ সালে দল দুটি সর্বশেষ একটি প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল। বর্তমান প্রজন্মের আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়েরা কখনোই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি, যদিও স্কোয়াডের ছয়জন ফুটবলারই ইংল্যান্ডের ক্লাব ফুটবলে খেলেন। তা সত্ত্বেও, আর্জেন্টিনা দল ও তাদের সমর্থকদের সংস্কৃতিতে এই ইংল্যান্ডবিরোধী মনোভাব একটি প্রধান অংশ জুড়ে রয়েছে।
কেন ফকল্যান্ড যুদ্ধ নিয়ে গান গায় আর্জেন্টিনা?
সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর মাঠের উদযাপন আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুম পর্যন্ত গড়ায়। জাতীয় দলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করা ভিডিওতে দেখা গেছে এক আনন্দঘন ড্রেসিংরুমের চিত্র। সেখানে কিংবদন্তি ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও বর্তমান অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে উৎসর্গ করে গাওয়া একটি স্লোগানে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়।
পুরো দল সমস্বরে গাইছিল, ‘পর মালভিনাস, পর এল ডিয়েগো, পর লা আলতিমা দে লিও’। অর্থাৎ, ‘মালভিনাসের জন্য, ডিয়েগোর জন্য এবং লিওর শেষ (টুর্নামেন্ট)-এর জন্য।’
‘লাসমালভিনাস’ হলো ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের আর্জেন্টাইন নাম। এটি মূলত ব্রিটিশদের একটি অধীনস্থ অঞ্চল, যা আর্জেন্টিনার মূল ভূখণ্ডের পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে অবস্থিত। ১৯৮৭ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে এই অঞ্চলটি ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য আক্রমণ চালায়। ১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর্জেন্টিনার আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। যুদ্ধে ৩ জন বেসামরিক নাগরিক, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা এবং ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা নিহত হন। বর্তমানে সেখানে ৪ হাজারেরও কম মানুষ বসবাস করেন।
ফকল্যান্ড এখনও আর্জেন্টিনার জাতীয়তাবাদের এক বড় প্রতীক। চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এই দ্বীপে তাদের আক্রমণের ৪৪তম বার্ষিকী উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে লেখেন, লাসমালভিনাস আর্জেন্টিনার ছিল, আছে এবং সব সময় আর্জেন্টিনারই থাকবে।
এই যুদ্ধের ঠিক চার বছর পর, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের এক মহাকাব্যিক কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে পরাজিত করে আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনা একাই আর্জেন্টিনার পক্ষে দুটি গোল করেছিলেন এবং তার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটি ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইনদের উৎসর্গ করেছিলেন।
১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনার দুটি বিশ্বকাপ জয়ের মাঝামাঝি সময়ে ফকল্যান্ড যুদ্ধটি হয়েছিল। আর এই যুদ্ধের প্রতীকী রূপ এবং ফুটবলের সেই ঐতিহাসিক সাফল্যই পরবর্তীতে আর্জেন্টাইন ফ্যান সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
যুদ্ধ নিয়ে আর কি কি ঘটনা আছে?
২০২২ সালে আর্জেন্টিনার ‘মুচাচোস’ স্লোগানটি খেলোয়াড় ও ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এই গানের কথায় ম্যারাডোনা, মেসি, আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং ফকল্যান্ডের কথা উঠে এসেছে। যার প্রথম স্তবকেই বলা হয়েছে, ‘মালভিনাসের সেই ছেলেরা, যাদের আমি কখনোই ভুলব না।’
২০২২ সালে যখন আর্জেন্টিনা তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতে, তখন বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে খেলোয়াড়েরা ব্যাপক উদযাপন করেন। ফরোয়ার্ড লাউতারো মার্তিনেসের নেতৃত্বে পুরো দল এবং স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৮৫ হাজার দর্শক ফকল্যান্ড যুদ্ধকে টেনে এনে আরও একটি ইংল্যান্ডবিরোধী স্লোগান ধরেন। ২০২২ সালের জুনে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জয়ের পর ড্রেসিংরুমেও খেলোয়াড়েরা এই একই গান গেয়েছিলেন।
সেই গানের কথাগুলো ছিল, ‘আমরা আর্জেন্টিনার দল এবং আমরা সব সময় আমাদের দলকে সমর্থন করব, কারণ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন আমাদের আছে। আমি এমনই, আমি আর্জেন্টাইন, মালভিনাসের সেই শালার ইংরেজদের আমি ভুলিনি। আমি এমনই, আমি তোমাদের উৎসাহিত করতে এসেছি, আর্জেন্টিনাকে আমি সব জায়গায় অনুসরণ করি।’
২০২২ সালে আন্দ্রেস কালামারোর মূল গান ‘লা পার্তে দে আদেলান্তে’-এর সুরে আর্জেন্টিনার ভক্তদের মাঝে আরেকটি স্লোগান জনপ্রিয় হয়। যেখানে ‘আমরা ইংরেজদের সব জায়গায় তাড়া করেছি’ লাইনের পাশাপাশি ফকল্যান্ড নিয়ে কিছু আবেগঘন কথা ছিল: ‘স্বদেশের পতাকার রঙের জন্য আমি জীবন দিতে পারি, যেমনটা মালভিনাসের সেনারা দিয়েছিল। আমি যখন মারা যাব, তখন কোনও ফুল চাই না, আমি কেবল এমন একটি কাপড় চাই যাতে এই (পতাকার) রংগুলো থাকবে।’
অন্যান্য বিতর্কিত স্লোগান
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে একটি ‘বর্ণবাদী এবং বৈষম্যমূলক’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে আইনি নালিশ করার কথা জানায়। কোপা আমেরিকা জয়ের পর আর্জেন্টিনার এনজো ফের্নান্দেসের পোস্ট করা একটি লাইভ ভিডিওতে দেখা গেছে, তিনি ও তার বেশ কয়েকজন সতীর্থ ফ্রান্স জাতীয় দলকে নিয়ে কটু মন্তব্য করছেন, ‘তারা ফ্রান্সের হয়ে খেলে, কিন্তু তাদের বাবা-মা অ্যাঙ্গোলার। তাদের মা ক্যামেরুনের, আর বাবা নাইজেরিয়ার। কিন্তু তাদের পাসপোর্টে লেখা ফ্রেঞ্চ।’
২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সকে হারানোর পরও আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা এই গানটি গেয়েছিলেন, যা মূলত ফ্রান্সের অনেক খেলোয়াড়ের আফ্রিকান বংশোদ্ভূত হওয়া এবং প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী হওয়াকে কটাক্ষ করে তৈরি। চেলসিতে এনজোর কৃষ্ণাঙ্গ সতীর্থ ও ফরাসি ফুটবলার ওয়েসলি ফাফানা এই ঘটনার ভিডিও শেয়ার করে ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘২০২৪ সালের ফুটবল: বাধাহীন বর্ণবাদ।’ পরবর্তীতে এনজো ফার্নান্দেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমা চেয়ে স্বীকার করেন যে, ‘এই গানটিতে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষা রয়েছে এবং এই শব্দগুলোর পক্ষে কোনও অজুহাত চলে না।’
অন্যান্য দেশের চিত্র
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে উয়েফা স্পেনের দুই তারকা আলভারো মোরাতা এবং রদ্রিকে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করে। ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর মাদ্রিদে উৎসবের র্যালিতে অসদাচরণের জন্য তাদের এই শাস্তি দেওয়া হয়। ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, এই দুজন মিলে স্লোগান দিচ্ছেন: ‘এটি স্প্যানিশ, জিব্রাল্টার স্পেনের।’ জিব্রাল্টার হলো আইবেরিয়ান উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি ব্রিটিশ ভূখণ্ড। জিব্রাল্টার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এই স্লোগানটিকে ‘অত্যন্ত উসকানিমূলক এবং অপমানজনক’ বলে অভিহিত করেছিল। তবে স্প্যানিশ ফুটবলার্স অ্যাসোসিয়েশন এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘স্বৈরাচারী ও অন্যায্য সিদ্ধান্ত’ বলে নিন্দা জানায় এবং বলে যে খেলোয়াড়েরা কেবল তাদের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করেছেন এবং তাদের অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের সমর্থকদের একাংশও জার্মানির বিপক্ষের ম্যাচগুলোতে ‘দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং একটি বিশ্বকাপ’ এবং ‘টেন জার্মান বোম্বার্স’ (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উপহাস করা গান) গান গাওয়ার জন্য কুখ্যাত। ২০১৭ সালে জার্মানির ডর্টমুন্ডে একটি প্রীতি ম্যাচে এই স্লোগান দেওয়ার পর তৎকালীন ইংল্যান্ড কোচ গ্যারেথ সাউথগেট বলেছিলেন, ‘এটি সম্পূর্ণরূপে অনভিপ্রেত। আমরা সেই সময় পার করে এসেছি, অথবা আমাদের পার করে আসা উচিত ছিল।’ তবে ২০২৪ সালের জুনে নিউক্যাসলে ইংল্যান্ড যখন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে পরাজিত করে, তখনও ম্যাচের আগে ‘টেন জার্মান বোম্বার্স’ গানটি গাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পায়।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস