ব্রাজিলের কংগ্রেস নির্বাচনে এবারও দেখা যাচ্ছে ব্যতিক্রমী নাম ও পরিচয়ে প্রার্থীদের অংশগ্রহণ। ৫৯ বছর বয়সী হেলিকপ্টারচালক প্লিনিও ভিসেন্তিন জুনিয়র এবার প্রথমবারের মতো কংগ্রেস নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তবে নির্বাচনী প্রচারে তিনি পরিচিত হচ্ছেন ‘প্লিনিও ট্রাম্প’ নামে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুলের ধরন, লম্বা কমলা টাই, করমর্দন এমনকি হাঁটার ভঙ্গিও অনুকরণ করছেন তিনি।
মিনাস জেরাইস রাজ্যের জুইস দি ফোরা শহরে প্রচারের সময় পুরোনো পন্টিয়াক গ্র্যান্ডভিল গাড়িতে করে ঘুরেছেন প্লিনিও ট্রাম্প। গাড়ির সামনের দিকে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। তাকে দেখে পথচারীদের অনেকেই থেমে তাকাচ্ছিলেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে প্লিনিও ট্রাম্প বলেন, ট্রাম্প তার কাছে জনপ্রিয় ও আইকনিক। তার প্রচারে খুব কম মানুষই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন বরং বেশির ভাগ মানুষ হাসিমুখে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ব্রাজিলের রাজনীতিতে এমন ব্যতিক্রমী বা রসিকতা-নির্ভর প্রার্থীর উপস্থিতি প্রায় আট দশকের পুরোনো। তাদের কেউ প্রতিবাদী প্রার্থী, কেউ আবার কৌতুকধর্মী প্রার্থী হিসেবে পরিচিত। কংগ্রেস নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে তাদেরও অন্য প্রার্থীদের মতোই দেশটির ৩০টি রাজনৈতিক দলের যেকোনও একটির সদস্য হতে হয় এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হয়।
এবার কংগ্রেসের আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৭ হাজার ৮০০-এর বেশি প্রার্থীর মধ্যে কয়েক শ এমন ব্যতিক্রমী প্রার্থী রয়েছেন। রাজ্য আইনসভাতেও রয়েছেন আরও অনেকে।
তবে এসব প্রার্থীর ভোট শুধু তাদের ব্যক্তিগত ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলে না। ব্রাজিলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বব্যবস্থায় প্রার্থীদের পাওয়া ভোট তাদের দলের মোট ভোটের হিসাবেও যুক্ত হয়। ফলে এমন প্রার্থীরা বেশি ভোট পেলে তাদের দল কংগ্রেসে বেশি আসন পেতে পারে এবং বেশি সরকারি অর্থও পেতে পারে।
শুধু ট্রাম্প নন, ব্রাজিলের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নামও ব্যবহার করছেন এক প্রার্থী। ক্লদিও হেনরিকি দোস আনজোস ‘হেনরিকি বারাক ওবামা’ নামে পরিচিত। এর আগে রিও দি জেনেইরোতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর এবার তিনি রাজধানী ব্রাসিলিয়াভিত্তিক ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট থেকে সিনেটের দুটি আসনের একটির জন্য প্রার্থী হয়েছেন।
আরেক প্রার্থী ওয়ালসি ক্যালিস্তো ভিয়েরা ‘মাইক জ্যাগার’ নামে মধ্যাঞ্চলীয় গোইয়াস রাজ্যের আইনসভায় আবারও প্রার্থী হয়েছেন। ৬৬ বছর বয়সী এই ব্যক্তি অবশ্য রকস্টার নন তিনি একজন কাঠমিস্ত্রি। তার এলোমেলো চুল ও কপাল ছুঁয়ে থাকা ঝুঁটি তাকে রোলিং স্টোনসের গায়ক মাইক জ্যাগারের নাম ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে।
কেউ আবার তারকা অনুকরণের বদলে বেছে নিয়েছেন অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় নাম। মিনাস জেরাইসের রাজ্য আইনসভার প্রার্থী শেইলি আপারেসিদা সোয়ারেস ব্রান্দাওয়ের নির্বাচনী নাম ‘সুনামি গ্র্যান্ডমাদার’। পিয়াউই রাজ্যের আইনসভার প্রার্থী ফ্রান্সিসকো দাস শাগাস কোস্তা অলিভেইরার নাম ‘হু হু’।
ব্রাজিলে এমন প্রার্থীর ঐতিহ্য শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। সে সময় সাও পাওলো শহরের প্রায় ১ লাখ ভোটার সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে চিড়িয়াখানার ক্যাকারেকো নামের একটি গণ্ডারের নাম ব্যালটে লিখেছিলেন। পরে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ সেই ভোট বাতিল করে।
১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনের সময় এমন রাজনৈতিক কৌতুকধর্মী কর্মকাণ্ড বন্ধ ছিল। তবে ১৯৮৯ সালে জাতীয় নির্বাচনে ফিরে এসে আলোচনায় আসেন চিকিৎসক এনিয়াস কারনেইরো। মাত্র ১৫ সেকেন্ডের রেডিও ও টেলিভিশন প্রচারে তিনি দ্রুতগতিতে জটিল বক্তব্য দিতেন। তার প্রচারের শেষ কথা ছিল আমার নাম এনিয়াস! সেই নির্বাচনে তিনি প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ভোট পান।
২০১০ সালে এই ধারার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হয়ে ওঠেন সার্কাসের কৌতুকশিল্পী তিরিরিকা। সাও পাওলো থেকে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচনে তিনি ১৩ লাখের বেশি ভোট পান। তার প্রচারের স্লোগানের মধ্যে ছিল, এর চেয়ে খারাপ আর হতে পারে না এবং ফেডারেল কংগ্রেসম্যান কী করেন? আমি সত্যিই জানি না। আমাকে ভোট দিন, আমি আপনার হয়ে জেনে নেব।
সাও পাওলোর ইনস্পার রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কার্লোস মেলোর মতে, ব্রাজিলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বব্যবস্থার কারণে তিরিরিকার মতো প্রার্থীরা নিজেদের পাওয়া ভোটের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারেন। কোনও কোনও প্রার্থী নিজের আসন জেতার মতো ভোট পান, আবার কেউ ১ হাজার বা ২ হাজার ভোট পেয়ে দলকে বাড়তি ভোট এনে দেন। ফলে তারা নিজেরা আসন না পেলেও তাদের দল কংগ্রেসে বেশি আসন এবং সরকারি অর্থ পেতে পারে।
সূত্র: এপি নিউজ