বেনজির হত্যার দায় অস্বীকার ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালেবান নেতার

পাকিস্তান তালেবানের একাংশের নেতা ইকরামুল্লাহ ২০০৭ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রায় ১০ বছর পর এক ভিডিও বার্তায় তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। মামলার তদন্তকারীদের ধারণা, হত্যাকাণ্ডের সময়  ১৬ বছর বয়সী এই তালেবান নেতা ঘটনাস্থল বিকল্প আত্মঘাতী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। প্রথম আত্মঘাতী ব্যর্থ হলে তার ওপর বোমা বিস্ফোরণের নির্দেশ ছিল।

ভিডিও বার্তায় ইকরামুল্লাহ

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, সম্ভবত পূর্বাঞ্চলীয় আফগানিস্তানে ধারণ করা এক ভিডিওতে বেনজির হত্যায় ও জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন ইকরামুল্লাহ। প্রতিদ্বন্দ্বি গ্রুপ আর পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর তরফে তার পরিবার  হুমকি পাওয়ার পর তিনি এই ভিডিও বার্তা দিয়ে থাকতে পারেন বলে জানিয়েছে বিবিসি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পাকিস্তান তালেবানের নতুন নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এই ভিডিও সামনে এনেছে বিচ্ছিন্ন আরেকটি অংশ।

১৯৮৮ আর ’৯৩ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া বেনজির ভুট্টো ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির এক নির্বাচনি সমাবেশে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন। দেশটির কর্মকর্তাদের মতে, ১৫ বছর বয়সী হামলাকারী নিজেকে উড়িয়ে দেওয়ার পর বেনজির নিহত হলে সেখান থেকে হেঁটে বেরিয়ে যান ইকরামুল্লাহ। টিটিপি নামে পরিচিত পাকিস্তান তালেবানের সদ্য নিয়োগ পাওয়া প্রধান নুর ওয়ালি মেহসুদ তার প্রকাশিত বইয়ে এই হামলায় তার সংগঠনের জড়িত থাকার দায় স্বীকার করে নিয়েছেন।

পাকিস্তান তালেবানের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কারণে ভিন্ন গ্রুপে রয়েছেন মেহসুদ ও ইকরামুল্লাহ। ‘ব্রিটিশ রাজত্ব থেকে আমেরিকান সামাজ্যে’ শীর্ষক বইতেও মেহসুদ রাওয়ালপিন্ডির ঘটনাস্থলে ইকরামুল্লাহর উপস্থিতির কথা বলেছেন।

পাকিস্তান তালেবানের পূর্বাঞ্চলীয় আফগানিস্তানভিত্তিক বিচ্ছিন্ন একটি অংশের প্রকাশ করা একটি ভিডিও হাতে পাওয়ার কথা জানিয়েছে বিবিসি। ওই ভিডিওতে ইকরামুল্লাহকে গ্রুপটির ‘‌ঊর্ধ্বতন নেতা’ আখ্যায়িত করে বলা হয় তিনি বেনজির হত্যায় জড়িত ছিলেন না, এমনকি বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না। তবে এখনও পাকিস্তানের অন্যতম সন্দেহভাজন জঙ্গি তালিকায় রয়েছেন ইকরামুল্লাহ। বেনজির হত্যা মামলার আদালতের নথিতেও দ্বিতীয় হামলাকারী হিসেবে নাম রয়েছে তার। ধারণা করা হয়, ওই ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে অন্যতম জীবিত ব্যক্তি তিনি। অন্য হামলাকারীদের অনেকেই সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছেন।

তবে ভু্ট্টোর এক ঊর্ধ্বতন সহকারী বলছেন, ইকরামুল্লাহ মিথ্যা বলছেন। বেনজিরের ঘনিষ্ঠ সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পাকিস্তানের সিনেটর রেহমান মালিক বিবিসিকে বলেছেন, ইকরামুল্লাহ ভিডিওতে সম্পূর্ণ মিথ্যে বলেছেন। অন্য সন্দেহভাজন হামলাকারীরা আদালতের স্বাক্ষ্যে তাকে দ্বিতীয় হামলাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পাকিস্তান তালেবানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, এই ভিডিও প্রকাশের আগে প্রকাশ্যে আর গর্ব নিয়ে বেনজির হত্যায় জড়িত থাকার কথা বলে বেড়াতেন ইকরামুল্লাহ। কিন্তু গত বছর আফগানিস্তানে প্রতিদ্বন্দ্বি সশস্ত্র গ্রুপের হামলার মুখে পড়েন তিনি। আর তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিয়েছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী। 

ওই সূত্রের মতে, এসব কারণেই গ্রুপের শীর্ষ নেতাদের পরামর্শে বেনজির হত্যায় জড়িত থাকার দায় অস্বীকারের ভিডিও প্রকাশ করেছেন ইকরামুল্লাহ। সূত্রটিকে ঊদ্ধৃত করে বিবিসি লিখেছে, ‘পাকিস্তান তালেবানের সবাই এমনকি উপজাতি এলাকার ছোট শিশুরাও জানে ওই ঘটনায় তার জড়িত থাকার কথা জানে।’

দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েও সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ ক্ষমতা দখল করে নিলে নির্বাসিত হতে বাধ্য হয়েছিলেন বেনজির ভুট্টো। নির্বাচনি প্রচার চালাতে ২০০৭ সালে দেশে ফেরেন তিনি। ওই সময়েও তাকে লক্ষ্য করে করাচি বিমানবন্দরে হামলা চালায় পকিস্তান তালেবান। বেনজির বেঁচে গেলেও নিহত হয় তাকে স্বাগত জানাতে জড়ো হওয়া অন্তত দেড়শো মানুষ। এর দুই মাসের মধ্যে রাওয়ালপিন্ডিতে নিহত হন তিনি।

পাকিস্তান তালেবানের তৎকালীন প্রধান বায়তুল্লাহ মেহসুদ (২০০৯ সালে মার্কিন ড্রোনা হামলায় নিহত) হামলায় নিজের গ্রুপের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে পাকিস্তানি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বায়তুল্লাহ মেহসুদ ও তার এক অনুসারীর মধ্যকার ফোনালাপ হস্তগত করার দাবি করেন। ওই ফোনালাপে বলা হয় ইকরামুল্লাহসহ ‘আমাদের অনুসারীরা’ বেনজিরের হামলাকারী ছিল।

পাকিস্তান তালেবানের সদ্য প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া নুর ওয়ালি মেহসুদও তার ‘ব্রিটিশ রাজত্ব থেকে আমেরিকান সামাজ্যে’ শীর্ষক বইতেও তাদের গ্রুপের জড়িত থাকার কথা বলেছেন। ওই সময়ে তালেবানদের প্রধানর বিচারকের দায়িত্বে থাকা ওয়ালি মেহসুদও লিখেছেন, দ্বিতীয় হামলাকারী হিসেবে ছিল ইকরামুল্লাহ। এই বইতে দাবি করা হয়েছে, মুজাহিদিনদের লক্ষ্যবস্তু বানানো ও আমেরিকার স্বার্থের প্রতি সহানুভূতিশীল সরকার গঠনের পরিকল্পনা করায় বেনজিরকে হত্যা করে তাদের গ্রুপ।

বিবিসির হাতে পাওয়া ভিডিওতে এসব দাবি অস্বীকার করেছেন তালেবান গ্রুপটির বিচ্ছিন্ন অংশটির শীর্ষ নেতা শেহরিয়ার। তিনি ওই ভিডিওতে দাবি করেছেন, এই ঘটনায় ইকরামুল্লাহকে জড়ানো নাস্তিকদের সংবাদমাধ্যম ও মুরতাদদের কাজ। ভিডিওতে হামলার জন্য পাকিস্তানের তখনকার প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ ও গোয়েন্দা বাহিনীকে দায়ী করেন তিনি। তবে এই হত্যা ষড়যন্ত্রে পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও আদালতে হাজির হতে হয়নি তাকে। বর্তমানে দুবাইয়ে নির্বাসিত জীবন কাটানো পারভেজ বরাবরই বেনজির হত্যায় জড়িত থাকা বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

পাকিস্তানের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক বলেছেন, বেনজির হত্যার অভ্যন্তরীণ তথ্য নিয়ে বেঁচে থাকা একমাত্র মানুষ ইকরামুল্লাহ। বাকিদের বেশিরভাগই বিভিন্ন সময়ে নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ইকরামুল্লাহ সম্ভবত আফগান কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হয়ে পাকিস্তানে প্রত্যাবাসিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে দায় অস্বীকার করেছেন। এছাড়া পাকিস্তান তালেবানের নতুন নেতৃত্বকেও চ্যালেঞ্জ জানাতেও তিনি এটি করে থাকতে পারেন বলে মনে করেন রেহমান। তিনি ইকরামুল্লাহকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

বেনজির হত্যায় জড়িত থাকার দায়ে পাঁচ জঙ্গিকে অভিযুক্ত করে রায় ঘোষণা করেছে পাকিস্তানের আদালত। এখন আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে ওই মামলা।