‘দিন শেষে সব উপনিবেশবাদই হেরে যায়।’ ২০ বছর আগে কথাটা বলেছিলেন ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ প্যাট্রিক চাবাল। সোজা চোখে দেখলে তার কথা ২০ বছর পর সত্য হয়ে গেলো আফগানিস্তানে। কিন্তু ঘটনা দেখতে যতটা সিনেমাটিক ছিল, আদৌ তেমনটা ছিল কি? ঘটনা কি রাতারাতিই ঘটেছে? নাকি বোকা ‘ঈগল’ বুঝতেই পারেনি যে তার নীড়ে এসে অন্য পাখি ডিম পেড়ে যাবে।
আফগানিস্তান তালেবানের দখলে আসার মাসখানেক আগে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিক গিয়েছিলেন কুন্দুজের এক চেকপোস্টে। সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠে এক আফগান সার্জেন্টকে দেখলেন নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বসে থাকতে। যখন তখন হামলা চালাতে পারে তালেবান, তবু কারওর ভেতর নেই উত্তেজনা। খুঁচিয়ে কারণটা বের করলেন ওই সাংবাদিক। জানা গেলো, কুন্দুজের আফগান বাহিনীর সঙ্গে তালেবানদের একটা বোঝাপড়া হয়ে আছে। মার্কিন বাহিনী চলে গেলে রক্তপাত ছাড়াই সব তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে।
ঠিক এ কারণেই অনেকগুলো শহর কোনও ধরনের গোলাগুলি ছাড়াই দখল করে নিতে পেরেছে তালেবানরা। মার্কিন বাহিনীকে দিয়ে যে বাড়বাড়ন্ত কিছু হবে না, সেটা হয়তো আগেই ধরে নিয়েছিল আফগান বাহিনী। আমেরিকা এখন যতই বলুক, আফগান বাহিনীর প্রশিক্ষণে তাদের অঢেল অর্থের অপচয় হয়েছে, তথাপি সত্যিকারের লড়াই করার মানসিকতা ও সাধারণ জনগণ পুরোপুরি তালেবানের বিপক্ষে থাকলে হয়তো ওরা এত সহজে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতের মুঠোয় আনতে পারতো না।
মোটকথা, নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ বলছে, আমেরিকান বাহিনী আসার শুরু কিংবা মাঝামাঝি সময় থেকেই আফগান বাহিনীর মধ্যে এক ধরনের গা-ম্যাজম্যাজে ভাব দেখা দেয়। মনে মনে তারা হয়তো ভাবছিল, মার্কিন-ন্যাটো থাকলে থাকুক, আর না থাকলে পরে একটা সমঝোতা করে নেওয়া যাবে। আমেরিকানরা তো আর দেশটাকে তুলে নিয়ে যেতে পারবে না। পারবে না এর সাড়ে তিন কোটিরও বেশি সাধারণ আফগানকে আশ্রয় দিতে। সুতরাং আফগানিস্তানে যা ঘটেছে, তা আগে থেকেই ছিল অগস্ত্য যাত্রা।
আবার টাইম পত্রিকার বিশ্লেষণ অনুযায়ী যতটা সহজে তালেবানের হাতে আমেরিকার রেখে যাওয়া অজস্র যন্ত্রপাতি, গাড়ি ও যুদ্ধাস্ত্র তালেবানের হাতে চলে এলো তাতে বোঝা যায়, ওগুলো যেন তালেবানদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই অপেক্ষা করছিল আফগানি সেনা ও পুলিশ। দশক শেষে আমেরিকানরা যা বুঝতে পারলো সেটা হলো, আট হাজার তিন শ’ কোটি ডলার ও অজস্র যন্ত্রাপতির ঝনঝনানি থাকা সত্ত্বেও একটা বড় ঘাটতি ছিল আফগান বাহিনীতে- লড়াই করার প্রেষণা। আর তাই গত সোমবার (১৬ আগস্ট) মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিবের মুখপাত্র জন কিরবি টাইম ম্যাগাজিনকে বলেছিলেন, ‘টাকা দিয়ে কারও ইচ্ছে কেনা যায় না, নেতৃত্ব কেনা যায় না।’
শুধু ডলারের দোষ দিয়েও লাভ নেই। মার্কিন গোয়েন্দারাও কোনও আগাম খবর পায়নি। বাইডেন আমেরিকান বাহিনী তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন এপ্রিলে। এই ফাঁকে সিআইএ জানতে পারেনি যে কাবুল এয়ারপোর্টে আসা নিয়েও পালাতে চাওয়া লোকজনদের এতটা বিপদে পড়তে হবে। এতেও মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায় যে আফগান বাহিনীই হয়তো চায়নি যে ‘ঝামেলা’ দীর্ঘায়িত হোক। তাদের মাঝে এমন অসহিষ্ণুতা না থাকলে এত এত মার্কিন প্রযুক্তিকে ফাঁকি দিয়ে তালেবানরা কী করে এত দ্রুত সংগঠিত হয়ে একটার পর একটা শহর দখলে নিলো?
আফগানিস্তানে মার্কিন কমান্ডারদের পরামর্শক ছিলেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্টিফেন বাইডেল। টাইম ম্যাগাজিনকে বললেন, ‘সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাটা মূলত একটা জাতীয় সংকেতের কাজ করেছে। যে সংকেতের একই পাঠোদ্ধার করেছে সবাই। আবার এপ্রিলের আগেই কিন্তু আফগান বাহিনী ধীরে ধীরে পরাজয়ের দিকে হাঁটছিল। আমেরিকানরা ফিরে যাওয়ার কথা বলতেই তাদের ভেতর হার স্বীকারের তাড়নাটা ভীষণভাবে জেগে ওঠে।’
টাইম ম্যাগাজিনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রবার্ট বার্নস লিখেছেন, সমস্যাটা ছিল আরেকটু গভীরে। মার্কিন বাহিনী এমন এক সময় আফগান বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল, যখন কিনা তারা আবার তালেবানদের সঙ্গেও বিক্ষিপ্তভাবে লড়ে আসছিল। আবার এরসঙ্গে দেশটিতে গণতান্ত্রিক-রাজনীতির আবহ নিয়ে আসার কাজও করতে হচ্ছিল যখন দেশটি ডুবে ছিল দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির চোরাবালিতে।
তিনি আরও বলেন, বছরের পর বছর মার্কিন সামরিক নেতারাও এসব সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে বারবার বলে গেছেন, সফলতা আসবেই। তারা আফগানিস্তানের হাওয়া বুঝতে পারেনি। তারা বিলিয়ন ডলার খরচ করার আগে আফগান বাহিনীর কাছে এটা জানতে চাননি যে, তারা আদৌ তাদের দেশের জন্য মরতে রাজি আছে কিনা।