আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমস্যাটির সমাধান না করলে রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারে তাদের মাতৃভূমি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী ও ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নে সান লুইন। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লুইন বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আবারও এই সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হলে আমরা আমাদের নিজ ভূমি হারাব। সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো দায়মুক্তি। ১৯৭৮ সাল থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী দায়মুক্তির সঙ্গে কাজ করছে।
নে সান লুইন জানান, রাখাইন রাজ্যে জোরপূর্বক স্থানচ্যুতির পর বর্তমানে সেখানে প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম রয়েছেন। সাম্প্রতিক অনুমান অনুযায়ী, গত সপ্তাহেই ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা চলছে। তবে মামলাগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক সংস্থার হস্তক্ষেপ, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাব বা আন্তর্জাতিক জোট গঠন করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন লুইন। তিনি আরও সতর্ক করেন, যদি কোনও হস্তক্ষেপ না হয়, তাহলে আগামীতে রোহিঙ্গাদের মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। গত তিন থেকে চার মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে।
লুইন বলেন, বাকি থাকা ৬ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ৩ লাখই বুথিডাং ও মংডুর বাসিন্দা। তারা যদি এই দুই শহর হারায়, তাহলে তাদের আর ফিরে যাওয়ার কোনও স্থান থাকবে না। তিনি বলেন, সবকিছুই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করছে। তারা কীভাবে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা এবং তাদের নিজ ভূমিতে ফেরত নিশ্চিত করবে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
গত বছরের নভেম্বর থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করেছে। লুইন জানান, পুরো অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে আরাকান আর্মির প্রচেষ্টা রোহিঙ্গাদের আরও বেশি স্থানচ্যুতি, গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে জনগণের জন্য মানবিক সহায়তা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অপ্রাপ্য হয়ে পড়েছে।
লুইন আরও উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ৪০০টি গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছিল, শতাধিক নারীকে যৌন নির্যাতন করেছিল এবং এমনকি শিশুদেরও পুড়িয়ে হত্যা করেছিল।
তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির কেউই রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি উন্নয়নের ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। ফলে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একমাত্র আশা।
লুইন সতর্ক করেন, যদি বাংলাদেশ এই সমস্যার সমাধানে সফল না হয়, তাহলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশেই থাকতে হবে যতক্ষণ না পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
মিয়ানমারে বসবাসকারী ৬ লাখ রোহিঙ্গার জীবন দুটি ভিন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিবিরে বন্দি, যা কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা এবং নজরদারি টাওয়ার দ্বারা সুরক্ষিত, যা কার্যত একটি বন্দিশিবিরের মতো।
অন্যদিকে, বাকি রোহিঙ্গারা খোলা আকাশের নিচে বন্দি অবস্থায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে, বিশেষ করে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর আকার ধারণ করছে।