মার্কিন মিত্র সিউলের রাজনৈতিক অস্থিরতায় নজর কিম, শি ও পুতিনের

দক্ষিণ কোরিয়ায় মঙ্গলবার রাতে আকস্মিক রাজনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশটির স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ায় গোটা অঞ্চল এবং ওয়াশিংটনে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংকট এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা চরমে।

মঙ্গলবার রাতেই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওল অপ্রত্যাশিতভাবে সামরিক আইন জারি করেন। যদিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ব্যাপক বিরোধিতার মুখে সেই আদেশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন তিনি। এ সিদ্ধান্তকে দেশের প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে সমালোচকরা।

ইউন দাবি করেছেন, দেশের ‘গণতান্ত্রিক সংবিধান রক্ষার’ স্বার্থে ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিগুলো’কে প্রতিহত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পদক্ষেপের পর সিউলে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিও ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

প্রেসিডেন্ট ইউনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকেও অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিদেশি সামরিক ঘাঁটিগুলোর একটি।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দক্ষিণ কোরিয়া হলো উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসন রোধ এবং চীনের শক্তি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। এ ধরনের অস্থিতিশীলতা ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক নীতিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক মুখপাত্র প্রেসিডেন্ট ইউনের সামরিক আইন প্রত্যাহারের ঘটনায় ‘স্বস্তি’ প্রকাশ করেছেন। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া মৈত্রীতে আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে।

কূটনৈতিক জটিলতা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার মেয়াদকালে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এ বছরের শুরুতে তিনি ‘গণতন্ত্রের সম্মেলন’-এর আয়োজন দক্ষিণ কোরিয়ায় করার দায়িত্ব দেন এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করেন।

তবে ইউনের সামরিক আইন ঘোষণার ঘটনাটি এসব অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। ওয়াশিংটন ও টোকিওর সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে যাবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সংকট উত্তর কোরিয়া ও চীন-রাশিয়ার জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। স্টিমসন সেন্টারের র‍্যাচেল মিনইয়ং লি মন্তব্য করেন, দক্ষিণ কোরিয়া যদি একটি অনিশ্চিত মিত্রে পরিণত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতিগুলো ব্যাহত হতে পারে।

উত্তর কোরিয়ার সুযোগ

বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবেন। সাধারণত, দক্ষিণ কোরিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় পিয়ংইয়ং সামরিক পরীক্ষা চালিয়ে থাকে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এডওয়ার্ড হাওয়েল বলেন, উত্তর কোরিয়া সিউলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিদ্রূপ করতে পারে এবং রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ নিতে পারে।

চীন ও রাশিয়ার নজর

চীন ও রাশিয়া দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে বরাবরই বিরোধিতা করে আসছে। বিশেষ করে, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি চীনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিহত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অন্যদিকে, রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, যা এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক প্রভাব

দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকট কেবল দেশটির গণতন্ত্রকেই নয়, বরং বৈশ্বিক নীতিগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেনে উত্তর কোরিয়ার সম্পৃক্ততা এবং সিউলের সামরিক সহায়তার প্রস্তাব এ সময়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অক্সফোর্ডের হাওয়েল বলেন, বর্তমান সংকটে সিউল যদি তার মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করতে ব্যর্থ হয়, তবে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর প্রভাব পড়বে।

সূত্র: সিএনএন