পাকিস্তানে চলমান বর্ষা ও আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৩৪ জন। এতে আহত হয়েছেন ৫৯৬ জন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮২৬টি ঘরবাড়ি। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) জানিয়েছে, ২৬ জুন থেকে শুরু হওয়া এ দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন এ খবর জানিয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিজনিত দুর্ঘটনায় আরও ১২ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন দুজন পুরুষ, দুই নারী এবং আট শিশু। এছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন।
পাকিস্তানের আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিশেষ করে গিলগিট-বালতিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় গ্লেসিয়ার হ্রদের পানিবাহিত বন্যা, ভূমিধস ও শহরভিত্তিক জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাবুসার এলাকায় সোমবার হঠাৎ সৃষ্ট বন্যায় নিহত হয়েছেন পাঁচজন, যাদের মধ্যে চারজনই ছিলেন পর্যটক। ডায়ামির জেলার ডেপুটি কমিশনার আতাউর রহমান জানান, ওই ঘটনায় আরও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। প্রায় ৩০টি যানবাহন পানির তোড়ে ভেসে গেছে এবং ৭–৮ কিলোমিটার সড়ক ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চারটি সেতু, দুটি মসজিদ ও ৫০টির বেশি বাড়ি। বন্ধ হয়ে গেছে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী যৌথভাবে উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। হেলিকপ্টার ও সেনা সদস্যদের সহায়তায় ২০০ জনের বেশি পর্যটককে উদ্ধার করে চিলাসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে বিনা খরচে হোটেল খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এনডিএমএ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশ পাঞ্জাব, যেখানে প্রাণ গেছে ১৩৫ জনের—তাদের মধ্যে ৬৩ জনই শিশু। এছাড়া ২৪ জন নারী ও ৪৮ জন পুরুষও রয়েছেন মৃতদের তালিকায়। আহত হয়েছেন ৪৭০ জন।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় নিহত ৫৬ জনের মধ্যে ৩০ জন শিশু। সিন্ধুতে ২৪ জন, বেলুচিস্তানে ১৬ জন এবং আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরে দুইজন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ইসলামাবাদে প্রাণ গেছে এক শিশুর।
সোয়াতে পাঁচ শিশু বৃষ্টিজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। মালাম জাব্বার সুর ধেরাই এলাকায় এক নারী তার দুই ছেলেকে নিয়ে স্রোত পার হওয়ার সময় ডুবে যান। অন্যদিকে গুজর বান্দ শাঙ্কো এলাকায় বৃষ্টিতে একটি ঘর ধসে পড়ে নিহত হয় তিন শিশু ও আহত হন এক নারী।
ইসলামাবাদে এক সাবেক কর্মকর্তা ও তার ২৫ বছর বয়সী কন্যা বন্যার পানিতে গাড়িসহ ভেসে যান এবং পরে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (এনডিএম)-এর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৬২টি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং ৪৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ২৭টি ত্রাণ ও চিকিৎসা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। দুর্গতদের জন্য পাঠানো হয়েছে ৩ হাজার ৩৪৯টি জরুরি সামগ্রী, যার মধ্যে রয়েছে ৩৪৯টি তাঁবু, ৩৫৮টি কম্বল, ৫০০টি বালির বস্তা ও ৫৫৪টি রান্নার সেট।
পাকিস্তানের আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, পাঞ্জাব, খাইবার পাখতুনখোয়া, গিলগিট-বালতিস্তান, আজাদ কাশ্মীর ও ইসলামাবাদে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত চলবে। ২২ জুলাইয়ের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকার ছোট নদী-নালায় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়বে। ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, লাহোর ও গুজরানওয়ালাসহ বড় শহরগুলোতে শহরভিত্তিক বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে।
এনডিএমএ’র সব প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ, উদ্ধারকারী বাহিনী ও মানবিক সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলেছে।