টোকিও সফরে এসে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং। শনিবার (২৩ আগস্ট) টোকিওতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই নেতা নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে লি সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে কৌশলগত বার্তা দিলেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
বৈঠক শেষে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ইশিবা বলেন, আমাদের দুই দেশের চারপাশের কৌশলগত পরিবেশ দিন দিন জটিল হচ্ছে। তাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্ব যেমন বাড়ছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
লি জে মিয়ং জুন মাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক জাপান সফর। টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ইশিবার সঙ্গে বৈঠকে তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-কোরিয়া-জাপানের যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোতে সমন্বয় বাড়ানোর ব্যাপারে আলোচনা করেন।
দুই নেতা ‘শাটল কূটনীতি’ পুনরায় চালু করতে সম্মত হয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য খাতে সহযোগিতা জোরদার করার অঙ্গীকার করেছেন। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান বিনিময় কর্মসূচি ও কর্মরত অবস্থায় ভ্রমণ ভিসা দেওয়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখার ঘোষণা দেন ইশিবা ও লি।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লি’র আকস্মিক জয়ের পর টোকিওতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে, দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে সংকটে পড়তে পারে। কারণ, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োল সামরিক আইন জারির পর অভিশংসিত হন, আর লি অতীতে জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার সমালোচক ছিলেন। বিশেষ করে ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানের উপনিবেশবাদী শাসনের স্মৃতি এখনও কোরিয়ার সমাজে ক্ষোভের কারণ।
গত সপ্তাহেই দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার জাপানি নেতাদের টোকিওর ইয়াসুকুনি মন্দির সফরের প্রতি ‘গভীর হতাশা ও দুঃখ’ প্রকাশ করেছিল। কোরীয়দের কাছে এ মন্দির দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আগ্রাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তবে শনিবারের বৈঠকে লি স্পষ্ট করে বলেছেন, অতীতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
লি বলেন, আমরা একমত হয়েছি যে দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের অটল সহযোগিতা বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এমন একটি শুভচক্র তৈরি করতে চাই, যাতে কোরিয়া-জাপান সম্পর্কের উন্নয়ন আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তোলে।
চীনকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব ঠেকাতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল। তিন দেশের সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ৮০ হাজার মার্কিন সেনা, অজস্র যুদ্ধজাহাজ ও শত শত সামরিক বিমান মোতায়েন রয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশ ঘনিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপে টোকিও ও সিউল একমত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকির পরও তারা এ শুল্কহার স্থিতিশীল রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
আগামী সোমবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে লি চীন, উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের জন্য সিউলের আর্থিক অবদানের মতো জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। এর মধ্য দিয়ে পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।