ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এমন এক রাজনৈতিক দল, যা সবসময় তাদের ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে চিন্তা করে। দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠার আগেই লাখ লাখ মানুষ বিশ্বাস করতেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের আরও আগেই পদত্যাগ করা উচিত ছিল। নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং সিবিএসই-র অনলাইন মার্কিং পদ্ধতির চরম বিশৃঙ্খলা ভারতের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাকে কাঠের তাসের ঘরের মতো ভেঙে ফেলেছিল।
প্রতিবাদের সূচনা হয়েছিল পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন দিয়ে। তবে গত ২০ জুলাই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর দিল্লি পুলিশ ও আরএএফের অমানবিক বলপ্রয়োগের ঘটনা পুরো পরিস্থিতিকে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পদত্যাগের কোনও নজির যেন তৈরি না হয়, সে জন্য বিজেপি নেতৃত্ব শুরুতে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে রক্ষার চেষ্টা করে বিলম্ব করেছিল। কিন্তু এতে বিজেপি সরকারের নমনীয়তার অভাব ও অনমনীয় ভাবমূর্তিই উঠে আসছিল।
এদিকে ২০ জুলাই থেকে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হলে চারপাশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধী দলের নেতারা অনশনরত ওয়াংচুকের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। অধিবেশনের প্রথম সপ্তাহ পুরোপুরি পণ্ড হয়ে যায়। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সংসদের ভেতর ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আটকও হন। সরকারের রাজনৈতিক লক্ষ্য কী, তা বিরোধী দলগুলো ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং ওয়াংচুককে বুঝিয়ে অনশন ভাঙাতে সক্ষম হলেও ততক্ষণে এই ক্ষোভের আগুন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) কিংবা ওয়াংচুকের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূর ছড়িয়ে পড়ে। কঠোর আইন বা ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের আশ্বাস দিয়ে সেই ক্ষোভের আগুন নেভানো সম্ভব হচ্ছিল না। সেখানে দরকার ছিল একটি বড় বলির, আর ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার সেই মুখটি ছিলেন স্বয়ং ধর্মেন্দ্র প্রধান।
বিজেপির এই কৌশলগত পিছু হটার পেছনে ছিল একটি বড় রাজনৈতিক সমীকরণ। আগামী ১৩ আগস্ট পর্যন্ত চলতে যাওয়া এই অধিবেশনে বহুল আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ‘সীমানা নির্ধারণ বিল (ডিলিমিটেশন বিল) পেশ করতে পারে সরকার। এর আগে এপ্রিল মাসে বিশেষ অধিবেশনে নারী সংরক্ষণ বিলের সঙ্গে যুক্ত করে এটি পাসের চেষ্টা করা হলেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে বিলটি ভেস্তে যায়। মোদি সরকারের কোনও সাংবিধানিক সংশোধনী বিল পাসের ক্ষেত্রে সেটিই ছিল প্রথম পরাজয়।
কিন্তু এপ্রিলের পর থেকে ভারতের রাজনৈতিক পটভূমি অনেকটাই বদলে গেছে। বিজেপি তাদের এমপি সংখ্যা ২৪০ থেকে বাড়িয়ে জোটগতভাবে ২৯৩ থেকে ৩১৮-এ উন্নীত করেছে। যার বড় কারণ তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিদ্রোহী এমপির এনডিএকে সমর্থন দেওয়া এবং শিবসেনার (ইউবিটি) ৬ জন এমপির শিন্দে দলে যোগ দেওয়া। অন্যদিকে রাজ্যসভায় এনডিএর আসন ১০১ থেকে বেড়ে ১৫২-তে দাঁড়িয়েছে।
শারদ পাওয়ার ও এম কে স্টালিনের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের রাজি করানো এবং দল ভাঙানোর এই বিশাল রাজনৈতিক কৌশলটি নেওয়া হয়েছিল সীমানা নির্ধারণ বিলের মতো বড় লক্ষ্য পূরণের জন্যই। এবারের পুরো বর্ষাকালীন অধিবেশনটি হওয়ার কথা ছিল বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল ও বিরোধী দলকে বিভক্ত করার এক বড় ক্ষেত্র। কিন্তু যন্তর মন্তরের তীব্র ছাত্র আন্দোলন বিরোধীদের হাতে সরকারবিরোধী মূল অস্ত্র তুলে দেয়, যা বিজেপির পার্লামেন্টারি এজেন্ডাকে আটকে দিয়েছিল। যন্তর মন্তরে আগুন জ্বলতে রেখে সরকার সংসদে নিজেদের এই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারত না। আর তাই বাধ্য হয়ে প্রধানকে বিসর্জন দিতে হলো।
একদিকে ছিলেন প্রধান এবং সরকারের ভাবমূর্তি, অন্যদিকে কঠোর পরিশ্রম ও ডিলিমিটেশন বিল পাসের মতো বিশাল এক লক্ষ্য। পরিস্থিতি সামলে ভবিষ্যতে আরও বড় লড়াই জেতার জন্য মোদি সরকার কৌশলগতভাবে পিছু হটেছে। ইতোপূর্বে দীর্ঘ কৃষক আন্দোলনের পর তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করাও ছিল বিজেপির এমনই এক কৌশলগত পিছু হটায়ের উদাহরণ।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে