ভারতের শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর বিক্ষোভ স্থগিত হলেও পরিস্থিতির উত্তেজনা একেবারে কমে যায়নি। সরকারের সঙ্গে হওয়া চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তুলে নতুন করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে আন্দোলনকারী দল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তবে দলটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এখনও স্পষ্ট কিছু হাজির করা হয়নি।
নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর ও সংসদ স্ট্রিটে কয়েক দিন ধরে চলা তীব্র ছাত্র বিক্ষোভের জেরে গত শনিবার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। দেশজুড়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল এবং এর ফলে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ডানপন্থি সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। বিশ্লেষকরা একে মোদির শক্তিশালী ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন।
গত শনিবার সিজেপি নেতারা ও সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে কোনও বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালানো হবে না এবং বিদ্যমান মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে।
কিন্তু সোমবার সিজেপি অভিযোগ করে, মোদি সরকার সেই চুক্তি ভঙ্গ করেছে। দলটির দাবি, বিভিন্ন রাজ্যে শত শত শিক্ষার্থীকে আটক বা হয়রানি করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। এছাড়া শনিবার বিহারে পুলিশের গুলিতে তিনজন বিক্ষোভকারী আহত হন।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল, প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের জেরে আত্মহত্যা করা প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থীর পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং কোনও ফৌজদারি মামলা না রাখা। সরকার নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ সম্ভব ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়েছে।
তবে গত ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে মিছিলে পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) লাঠিচার্জে শতাধিক বিক্ষোভকারী আহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে কোনও ক্ষমা চাওয়া হয়নি। সিজেপি নেতারা ভিডিও ফুটেজ দেখে ওই পুলিশ সদস্যদের আদালতে টেনে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
ভারতের প্রধান বিচারপতির বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ বা ‘পরজীবী’ বলা মন্তব্যের সূত্র ধরে গত মে মাসে জন্ম নেয় সিজেপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে দলটির মূল চালিকাশক্তি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সিজেপি নেতারা এখনও স্পষ্ট কোনও রোডম্যাপ দেননি। দলের সদস্য সুধীর সাঙ্গওয়ান জানান, তারা এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন এবং বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। দলটির মুখপাত্র বৈষ্ণবী গৌর জানিয়েছেন, তারা কেবল শিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না, বরং বৃহত্তর এজেন্ডা নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যাবেন এবং টাউনহল বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান খুঁজবেন।
তবে আন্দোলনের সাফল্যের পর প্রথম প্রকাশ্য বার্তায় ভবিষ্যৎ নিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে এক ভিডিওতে ৩০ বছর বয়সী দিপকে ৩৭ দিনের আন্দোলনের কথা স্মরণ করে বলেন, পুরো সময়টা সত্যিই খুব কঠিন ছিল। এই সাফল্যই শেষ নয়। এটা তো সবে শুরু। ককরোচ জনতা পার্টির এখনও অনেক দূর পথ পাড়ি দিতে হবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অসীম আলীর মতে, এই নেতাদের রাজনৈতিক পটভূমি না থাকায় তাদের কোনও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেই।
এই পরিস্থিতিতে মাঠে নেমেছে বিরোধী দলগুলোও। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে গত ২০ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিতে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো তুলে ধরেন।
এদিকে সমাজবাদী পার্টির সাংসদ অখিলেশ যাদব ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে “নতুন প্রজন্মের বড় বিজয়” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এখান থেকে শিক্ষা নেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে আর প্রশ্ন ফাঁস না হয় এবং যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
সূত্র: আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান