যন্তর মন্তরের পর কলকাতাতেও কি পাখা গজাবে ককরোচ পার্টির

দিল্লির যন্তর মন্তরের সফল আন্দোলনের পর এবার পশ্চিমবঙ্গের দিকে নজর দিয়েছে অভিজিৎ দীপকে ও তার সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেহাল দশা ও মৌলিক সুবিধার অভাব প্রকাশ্যে আসায় সিজেপি-র এক কর্মী ও তার বাবার ওপর স্থানীয় বিজেপি কর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সে কর্মীর বাবা পরে মারা যান। এ নির্মম ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক এবং সিজেপি শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারকে ১০ দিনের আলটিমেটামসহ ৪ দফা দাবি জানিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে দিল্লির যন্তর মন্তরের মতো পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বড় ধরনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

কলকাতা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে বাঁকুড়া জেলায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনা পুরো এলাকাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। গত ১৩ আগস্ট সিজেপি কর্মী শেখ আব্দুল হাফিজ তার সাবেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান এবং সেখানকার জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও পানীয় জলের সংকট ভিডিও করেন। সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের ‘স্কুল ঠিক করো’ অভিযানের অংশ হিসেবে হাফিজ তার নিজের স্কুলের দুর্দশা তুলে ধরতে এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

হাফিজের অভিযোগ, ভিডিও ধারণ করে বাড়ি ফেরার পর রাত ৮টার দিকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি দল তার বাড়ি ঘেরাও করে। তারা ঘরে ঢুকে হাফিজকে মারধর করে এবং ফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও মুছে ফেলতে বাধ্য করে। এছাড়া হাফিজকে অন্য কারও প্ররোচনায় ভিডিও বানিয়েছেন, এমন স্বীকারোক্তি দিতে চাপ দেওয়া হয়। হাফিজ এতে রাজি না হলে ব্লেড, লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ওপর হামলা চালানো হয়। হাফিজকে বাঁচাতে গিয়ে তার বাবা মফিক মারাত্মক আহত হন। তার মাথায় শক্ত কিছুর আঘাত লাগে।

হামলাকারীরা বাড়ির বাইরে অবস্থান করায় দুই ঘণ্টা ধরে বাবা-ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরে পুলিশ এসে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরার পথে আবারও তাদের ওপর হামলা হয়। গত ১৫ আগস্ট মফিকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সে রাতেই তিনি মারা যান। হাফিজ ভিডিও বার্তা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের জীবনের নিরাপত্তা ও পরিবারের ওপর হুমকির কথা জানালে ঘটনাটি বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দেয়।

সিজেপির আইন বিভাগের প্রধান রত্না সিং একটি হাতে লেখা চিরকুট প্রকাশ করেন, যেখানে হাফিজ তাকে হুমকি দেওয়া পাঁচজনের নাম উল্লেখ করেছিলেন। তবে পুলিশকে ট্যাগ করলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে এক্স-এ পোস্ট করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং আশুতোষ রাঙ্কার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাঁকুড়ায় পাঠান। তীব্র বিতর্কের মুখে পুলিশ বিজেপি নেতা অষ্টম মাঝিসহ ৮ জনকে গ্রেফতার করে।

তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই হামলার সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে বলেন, হামলাকারীরা কেবলই দুষ্কৃতকারী, আর তাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, মফিকের ওপর নৃশংস হামলার খবর সত্যি নয়। রক্তচাপজনিত সমস্যার কারণে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

ঘটনার তদন্তে সোমবার সিজেপির সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং সরকার ও প্রশাসনের কাছে ৪ দফা দাবি তুলে ধরে ১০ দিনের আলটিমেটাম দেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সব আসামির বিরুদ্ধে এফআইআর, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আদালত-নিয়ন্ত্রিত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা প্রদান। রাঙ্কা জানান, হাফিজের পরিবার কোনও ক্ষতিপূরণ চায় না। তবে তার বাবার নামে গ্রামে একটি আধুনিক স্কুল গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছে।

মঙ্গলবারও এই বিতর্ক অব্যাহত থাকে। সিজেপি অভিযোগ করে যে বিজেপি কর্মীদের হুমকিতে তাদের একটি নির্ধারিত অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়েছে। সিজেপির পক্ষ থেকে হুশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, আমাদের যত বাধা দেবেন, আমরা তত বড় হব। আমাদের ‘ককরোচ অব বেঙ্গল’ টিম স্কুলে স্কুলে পরিদর্শন অব্যাহত রাখবে এবং রাজ্য সরকারকে সেগুলো সংস্কার করতে বাধ্য করবে।

পরে এক সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি নেতা রাঙ্কা বলেন, বিজেপি নেতারা হাফিজ এবং তার পরিবারকে হুমকি দিয়েছেন ও সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিয়েছেন। অথচ তারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে ২ হাজারেরও বেশি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, যেগুলো অবিলম্বে সংস্কার প্রয়োজন।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে