শিশুর জন্য ফুটপাতে দুধ গরম করছিলেন গৃহহীন মা, মন্ত্রীর ধমকে তীব্র বিতর্ক

কলকাতার ফুটপাতে নিজের শিশুর জন্য দুধ গরম করছিলেন এক গৃহহীন নারী। তা দেখে বেজায় চটে গেলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নগরোন্নয়ন ও পৌরবিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। ওই নারীকে কঠোর ভাষায় শাসন করার পাশাপাশি ফুটপাত থেকে তার জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই সমালোচনার মুখে পড়েছেন রাজ্যটির এই বিজেপি মন্ত্রী।

শনিবার কলকাতার পার্ক স্ট্রিট এলাকায় পরিদর্শনে বেরিয়ে ফুটপাতে জলন্ত উনুন দেখে গাড়ি থামান আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক ও মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। উনুন জ্বলতে দেখে তিনি ওই নারীকে জিজ্ঞেস করেন, কেন তিনি রাস্তায় রান্না করছেন। জবাবে পাশেই কোলপায় দেওয়া সন্তানকে দেখিয়ে ওই নারী জানান, আমি রান্না করছি না, শুধু বাচ্চাটার জন্য একটু দুধ গরম করছি।

এ কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে মন্ত্রী বলেন, ফুটপাতে বাচ্চার জন্য দুধ গরম করা হচ্ছে? পার্ক স্ট্রিটে? আপনাকে কে অধিকার দিয়েছে এখানে সংসার পাতবার?

এরপরই তিনি সঙ্গে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের ফুটপাত হকার মুক্ত রাখার নির্দেশ দেন। ফ্যাশন ডিজাইনার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া অগ্নিমিত্রা পুলিশকে বলেন, ফুটপাত খালি রাখা আপনাদের দায়িত্ব। আমাকে কেন এসে এসব করতে হবে আর বাজে হতে হবে?

ঘটনাটি ঘিরে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বামপন্থি নারী সংগঠন অল ইন্ডিয়া ডেমোক্রেটিক উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি মন্ত্রীর কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়ে বলে, জনপ্রতিনিধি হয়ে একজন মায়ের সঙ্গে কীভাবে এমন আচরণ করতে পারেন? প্রান্তিক মানুষের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা না করে একজন নারী মন্ত্রীর অন্য একজন নারীর প্রতি এমন অমানবিক আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়। পার্ক স্ট্রিটের সেই বৃদ্ধা মায়ের মতোই বহু মা সরকারি নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে ফুটপাতে সন্তান মানুষ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক ও মুখপাত্র কুণাল ঘোষও বিজেপির এই মন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ফুটপাত মুক্ত করা হোক, কিন্তু মানবিক মুখ মুছে ফেলে নয়। আমাদের আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় পুলিশ আর বুলডোজার দিয়ে সবকিছু করা যায় না। উন্নত পশ্চিমা দেশের রাস্তায়ও ভিক্ষুক দেখা যায়। এদের দৃষ্টিভঙ্গি যে গরিববিরোধী ও অমানবিক, তা বুঝতে বেশি কষ্ট করতে হয় না।

কুণাল ঘোষ জানান, তিনি ভুক্তভোগী ওই নারীর সঙ্গে দেখা করেছেন। নারীটি পাঞ্জাব থেকে এসেছেন, তার নাম সীতা (বর্তমানে রাশিদা)। স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এবং ছেলের মৃত্যুর পর দুই মেয়েকে নিয়ে রাস্তার পাশেই থাকেন তিনি। কুণাল ঘোষের ভাষায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই ফুটপাতে থাকেন। স্থানীয় দোকানদারদের সঙ্গেও কোনও ঝামেলা নেই। কিন্তু মন্ত্রীর মন্তব্যের পর পুলিশ তাকে সরে যেতে বলেছে। তার আকুতি: ‘আমার কাছে রাম আর আল্লাহ একই। কিন্তু এখন আমরা কী করব? কোথায় থাকব? কী খাব?’

অন্যদিকে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে এক বিবৃতিতে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, ফুটপাতে এভাবে থাকা নিরাপদ নয়। পথচারীদের নিরাপদে হাঁটার জন্যই ফুটপাত তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ যদি এভাবে জবরদখল করে থাকতে শুরু করে, তবে ধীরে ধীরে কলকাতার প্রতিটি রাস্তা ও ফুটপাত দখল হয়ে যাবে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস