নেপালে ভোটোকেশী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রবিবার (৩০ আগস্ট) নতুন করে বন্যার সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। দেশটিতে গত বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নিহত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে। এ অবস্থায় বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রবিবার ভোরে মানুষের মুঠোফোনে সরাসরি বন্যা সতর্কতার বার্তা পাঠানো হয়। একই সঙ্গে কাঠমান্ডুর সঙ্গে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর সংযোগকারী প্রধান মহাসড়ক চালুর জন্য কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এজেন্সির রবিবার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৮ জনে দাঁড়িয়েছে এবং এখনও ২,৫০২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে তিব্বত সীমান্তে ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ হওয়ার কথা জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে দুই দেশে মৃতের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন তিন হাজারের বেশি মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে কাজ, পর্বতভ্রমণ ও তীর্থযাত্রায় আসা ডজনখানেক দেশের শত শত বিদেশী নাগরিক রয়েছেন। তিব্বতে ২৬১ জন বিদেশী নিখোঁজ বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম, যার মধ্যে শতাধিক নেপালী নাগরিকও আছেন।
নেপালের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত ধাদিং জেলায় বাসিন্দারা তাদের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাড়িঘরে ফিরে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। বহু ঘরবাড়ির দেয়াল ভেসে গেছে, চারপাশ কাদা ও কাদা-মাটিতে ভরা।
ধাদিংয়ের বাসিন্দা শর্মিলা তামাং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেন, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই, এমনকি আমাদের ঘরবাড়িও না।
বন্যার তীব্রতায় চারটি জেলার ২০ হাজারেরও বেশি মানুষকে সেবা দেওয়া একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এবং সঞ্চালন লাইন কাদায় পেঁচিয়ে থাকায় বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলো বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। কাঠমান্ডুতে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট ‘পৃথিবী হাইওয়ে’-র বেশিরভাগ অংশ চালু হলেও কিছু অংশ এখনও মেরামত করা যায়নি।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী ধর্ম রাজ উপ্রেতী জানিয়েছেন, উজানে নদীর পানি বৃদ্ধির বিষয়ে চীন কর্তৃপক্ষ সতর্ক করার পর নতুন করে এই সতর্কতা দেওয়া হয়। তবে ক্রমাগত বন্যার সতর্কতায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয়রা। গোবিন্দ শ্রেষ্ঠ নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, গভীর রাতেও বারবার উঁচুতে দৌড়াতে হচ্ছে, যা তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি করছে।
হিমালয় অঞ্চলে বরফ ও পাথরের স্তূপ বা হিমবাহ ধসে এই আকস্মিক বন্যার উৎপত্তি হয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই ধসের তীব্রতা রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার ভূকম্পনের সমান ছিল। প্রবল গতিতে নেমে আসা পাথর ও গলে যাওয়া পানি নদীকে স্ফীত করে এই প্রলয়ঙ্ককারী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
এই বিপর্যয়ের পর নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে মাত্র ০.১ শতাংশ অবদান থাকা সত্ত্বেও নেপালের মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের বড় শিকার হচ্ছে।
এদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম রবিবার ঘোষণা দিয়েছেন যে, উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তা করতে এবং নিজ দেশের নাগরিকদের সরিয়ে নিতে মালয়েশিয়া নেপালে একটি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠাবে। একই সঙ্গে নেপালকে ১০ লাখ ডলার আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
সূত্র: এপি