কী, কেন, কীভাবে

ভারতে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে কেন প্রতিবাদ করছে জেন-আলফা

ভারতে জেন-জিদের নেতৃত্বে আন্দোলনের পর এবার স্কুলশিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রতিবাদের ঢেউ দেখা দিয়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে অন্তত ১০টি রাজ্যে স্কুলের ভবন, শিক্ষকসংকট, পানি, বিদ্যুৎ, বেঞ্চ ও খাবারের মান নিয়ে আন্দোলন করেছে শিক্ষার্থীরা। নতুন এই আন্দোলনকে অনেকে ‘জেন আলফা’ আন্দোলন হিসেবে দেখছেন।

উত্তর প্রদেশের সামুহি ভাটপুরওয়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২২ শিক্ষার্থী গত ২২ আগস্ট ক্লাসে ঢুকতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের দাবি ছিল, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন স্কুল ভবন নির্মাণ করতে হবে। জরাজীর্ণ ভবনটির একটি দেয়াল ২০২৩ সালে ধসে এক ছাত্রী গুরুতর আহত হয়েছিল।

আট বছর বয়সী প্রিয়া বলেন, আমি খুশি। আমরা নতুন ভবন পাব। আমরা (শিশুরা) ভয় পাই, একদিন স্কুল ভবনটি না ধসে পড়ে। এর অবস্থা খারাপ। এই ভয় আমাদের পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে দেয় না। এ কারণেই আমরা সবাই প্রতিবাদ করেছি।

মহারাষ্ট্র, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খন্ড ও মধ্যপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যের স্কুলেও একই ধরনের প্রতিবাদ হয়েছে।

কেন এই আন্দোলন

জুনের শুরুতে দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো তরুণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বেকারত্বের প্রতিবাদে নামে। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল মে মাসে গড়ে ওঠা ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরালো হয়। একপর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।

এরপর সংগঠনটি স্কুলগুলোর দুরবস্থার দিকে নজর দেয়। ১৫ আগস্ট তারা ‘স্কুল ঠিক করো’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করে।

সংগঠনটির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং বলেন, দিল্লির যন্তর মন্তরে আমাদের প্রতিবাদের সময় আমরা অনেক শিশু ও তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেছি, যারা গ্রামাঞ্চল থেকে এসেছিলেন। তারা স্কুলের খারাপ অবস্থা, শিক্ষকসংকট এবং স্কুলে যাওয়ার রাস্তার বেহাল অবস্থাসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা বলেছেন। আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ ভালো করার জন্য স্কুল ঠিক করার আন্দোলনটি আমাদের আন্দোলনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা।

স্কুলে কী কী সমস্যা

ভারতে প্রায় ১৫ লাখ স্কুলে ২৪ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এর প্রায় ৭০ শতাংশ সরকারি ব্যবস্থাপনায়। সরকারি হিসাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের উন্নতি হলেও অনেক স্কুলে এখনও মৌলিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।

অধিকারকর্মী নাগাসিমহা রাও বলেন, শিশুরা তাদের অধিকার চাইছে। তারা শিক্ষক, বেঞ্চ, স্কুল ভবন, পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচাগার চায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দীর্ঘদিন ধরে স্কুল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক অবকাঠামো ও জনবল নেই। দেশের অধিকাংশ সরকারি স্কুলের গল্পই এমন।

উত্তর প্রদেশের সর্বোদয় ইন্টার কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনোজ বলেন, স্কুলে পড়াশোনা করা আমাদের জন্য কতটা কঠিন, তা কেউ কল্পনাও করতে পারে না। বিদ্যুৎ নেই, তাই গরম ও আর্দ্র গ্রীষ্মে পাখাও চলে না। পানির ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মেঝেতে বসে। তাই আমরা প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তার সহপাঠী নীলম বলেন, এবার আমরা পোস্টার ও স্লোগান নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

বিহারের সিমুয়ারা গ্রামের প্রায় ৫০ শিক্ষার্থীও মধ্যাহ্নভোজের মান নিয়ে প্রতিবাদ করেছে। তাদের অভিযোগ, রান্নার আগে কাঁচামাল ঠিকভাবে পরিষ্কার করা হয় না। চাল, ডাল ও সবজির মানও খারাপ। অনেক সময় সবজি প্রায় পচা থাকে।

সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ভারতের ৩০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ১৮ বছরের নিচে। স্কুলের আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ভোটার হবে।

শিক্ষাবিষয়ক অ্যাক্টিভিস্ট আকাশ সরকার বলেন, শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তারা যদি উপযুক্ত পরিবেশে ভালো শিক্ষা না পায়, তাহলে ভারতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। এসব শিশুই আগামী দিনের ভোটার। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই তারা ভোট দেবে।

বেঙ্গালুরুর শিক্ষার্থী সুজাতা গৌড়া বলেন, এই ক্ষোভ অনেক দিন ধরে জমছে। এ কারণেই স্কুলের শিশুরাও প্রতিবাদ করছে। আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নতুন করে সাজাতে হবে। আমাদের যোগ্য শিক্ষক দরকার, পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে নিতে হবে, অবকাঠামো উন্নত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এর জন্য কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে হবে। তা না হলে দেশজুড়ে আরও প্রতিবাদ হতে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা