বিশ্বের কারখানা হিসেবে পরিচিত চীন তার অর্থনীতি গড়ে তুলেছিল উৎপাদন ও রফতানির ওপর ভর করে। আজ সেখানে কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছেন।
চীন এ বছর ১.২৭ কোটি স্নাতককে কর্মক্ষেত্রে পাঠিয়েছে-যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যাচ। মে মাসে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৫.৬ শতাংশ, যা তাদের চেয়ে বয়সে সামান্য বড়দের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। লাখ লাখ তরুণ শত শত জায়গায় আবেদন করেও কোনও চাকরি পাচ্ছেন না। সমস্যাটি কেবল নতুন স্নাতকদের নয়। এটি সেই কারখানার শ্রমিকদেরও, যারা মূলত চীনের অর্থনীতি তৈরি করেছিলেন।
দেশের অন্যতম বৃহৎ গাড়ি যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান চাংঝৌ সিংইউ অটোমোটিভ লাইটিং এ বছর ৪৪০ জন নতুন স্নাতককে চাকরি দিয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর, কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই ১০৭ জনকে বরখাস্ত করা হয়। সরাসরি একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়, সামান্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিদায় নাও, না হয় কারখানার মেঝেতে সাধারণ শ্রমিকের কাজ করো।
স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিষয়টি হস্তক্ষেপ করে। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি এবং সহানুভূতির অভাব স্বীকার করে এবং তাদের এইচআর ডিরেক্টরকে বরখাস্ত করে। কিন্তু কয়েক দিন পরেই, তারা বছরের প্রথম অর্ধে এক বিলিয়ন ডলার আয়ের কথা জানায় এবং ৫৬.৬ মিলিয়ন ইউয়ান লভ্যাংশ অনুমোদনের ঘোষণা দেয়। ফলে স্নাতকরা পেলেন শুধু বরখাস্তের ক্ষতিপূরণ, আর শেয়ারহোল্ডাররা পেলেন লভ্যাংশ।
এই ঘটনাটি চীনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার একটি নির্দিষ্ট কারণ ছিল। এটি মানুষের কাছে খুব ব্যক্তিগত এবং নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল। সাধারণ কারখানা শ্রমিকরা বলছেন, কয়েকটি কারণ তাদের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে। ওপর মহলের নির্দেশে কারখানায় স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিস্তার, কম মজুরির দেশগুলোতে কারখানা চলে যাওয়া এবং আবাসনে কাজ কমিয়ে দিয়েছে।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে, আবাসন খাতের সংকট তৈরি হওয়ার ফলে চীনের নির্মাণ খাত থেকে ১.৪ কোটিরও বেশি শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। এ বছর চীনের অস্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে ৩২ কোটি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা গত বছর ছিল ২৮ কোটি-এটি নিশ্চিত চাকরির সুযোগ দ্রুত কমে যাওয়ারই সংকেত।
কারখানার শ্রমিকরা প্রযুক্তি এবং অটোমেশনের কারণে কাজ হারাচ্ছেন, আর স্নাতকরা এমন চাকরির পেছনে ছুটছেন যার অস্তিত্বই আর নেই।
চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গত এক দশক ধরে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছে, কিন্তু বিশেষ করে গ্র্যাজুয়েটদের উপযুক্ত কাজের সুযোগ সেই হারে বাড়েনি। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এন্ট্রি-লেভেলের কাজগুলোকে কেড়ে নিচ্ছে, যে পদগুলোতে শুরুতেই স্নাতকরা কাজ করার সুযোগ পেতেন।
বেইজিং এই সমস্যাটি বুঝতে পারছে। তারা বিশেষ করে মানবিক শাখার হাজার হাজার অনুপযোগী বিশ্ববিদ্যালয় কোর্স বাতিল করেছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তি ও এআই-সম্পর্কিত ডিগ্রির দিকে চালিত করছে। কর্মকর্তারা ছয় মাসব্যাপী একটি জাতীয় নিয়োগ অভিযান শুরু করেছেন এবং এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এ বছর ১.২ কোটি শহুরে কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা করছেন।
সূত্র: এনডিটিভি