অটো চালিয়ে, পিৎজা হাটে কাজ করে ১০ হাজার ৯৬৪ কোটির সাম্রাজ্য

ট্রাকচালক ও শ্রমিকেরা কাজে না আসায় গ্রাহকের কাছে দেরির কারণ ব্যাখ্যা করার সুযোগ ছিল ড. ফারুক জি প্যাটেলের সামনে। কিন্তু তিনি তা না করে নিজেই কাজে নেমে পড়েন। গুজরাটের হাজিরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে ইট পৌঁছে দিতে নিজেই ট্রাক চালান। এরপর শ্রমিকদের সঙ্গে ইট নামানোর কাজও শুরু করেন। প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করেন তিনি। ইটের ধুলায় তার পোশাক লাল হয়ে যায়, পিঠে ইট বহনের কারণে ক্ষতও তৈরি হয়।

ফারুক প্যাটেল বলেন, প্রতিশ্রুতির বিষয়টি তিনি সবসময় গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। কাউকে কথা দিলে সেটি পূরণ করা নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন।

সেই সময় সীমিত সম্পদ ও অল্প কয়েকটি ট্রাক নিয়ে ছোট একটি পরিবহন ও মালামাল ব্যবস্থাপনার ব্যবসা চালাতেন তিনি। আজ তিনি কেপি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। গ্রুপটির তালিকাভুক্ত তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো কেপিআই গ্রিন এনার্জি, কেপি এনার্জি ও কেপি গ্রিন ইঞ্জিনিয়ারিং। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত গ্রুপটির সম্মিলিত বাজার মূলধন ১০ হাজার ৯৬৪ কোটি রুপি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ফারুক প্যাটেলের এই যাত্রা শুধু ব্যবসা বড় করার গল্প নয়। কখন কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, কখন একটি ব্যবসা থেকে সরে আসতে হবে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় কোনো খাতে কখন বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে হবে তারও গল্প এটি।

১৯৭২ সালের ২৪ মার্চ গুজরাটের ভরুচ জেলার সালাদরা গ্রামে জন্ম ফারুক প্যাটেলের। তিনি যখন দুই বছরের, ১৯৭৪ সালে তার বাবা গুলাম প্যাটেল ঝাগাদিয়া জিএসআরটিসি ডিপো থেকে সুরাটের আদাজান এসটি ডিপোতে বদলি হন। এরপর পরিবারটি সুরাটে চলে যায় এবং ছোট একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করে।

কৃষক পরিবার থেকে আসা তার বাবা ছিলেন বাস কন্ডাক্টর। ছোটবেলা থেকেই আর্থিক সচ্ছলতা না থাকার কারণে অর্থ ও পরিশ্রমের মূল্য বুঝতে শিখেন প্যাটেল।

দ্বাদশ শ্রেণির পর তার কর্মজীবন কোনও নির্দিষ্ট পথে এগোয়নি। তিনি একটি চশমার দোকানে কাজ করেন, অটোরিকশা চালান এবং আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা সম্পর্কে জানতে মুম্বাই যান। ১৯৯০ সালে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণও নেন। এরপর পোশাকের কাপড়ের দোকানে কাজ করেন এবং ছোট পরিসরে খুচরা ব্যবসারও চেষ্টা করেন।

১৯৯১ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং পিৎজা হাটে কাজ শুরু করেন। পরে সেখানে টিম লিডার হন। ভিন্ন ধরনের কর্মপরিবেশ ও কাঠামোবদ্ধ ব্যবসায়িক ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা হলেও একসময় তার মনে হয়, শুধু আর্থিক স্থিতিশীলতা নয়, নিজের কিছু করার আকাঙ্ক্ষাই তাকে বেশি টানছে।

১৯৯৩ সালে ভারতে ফিরে সুরাটে পরিবহন, মালামাল ব্যবস্থাপনা ও ছোট নির্মাণকাজে যুক্ত হন। ১৯৯৪ সালে আদাজান পাতিয়ার ফজল টাওয়ারের একটি ছোট অফিস থেকে কেপি গ্রুপের ভিত্তি গড়ে তোলেন। শুরুর মূলধন ছিল প্রায় ১ লাখ রুপি।

গুজরাটের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মালামাল পরিবহন ও ছোট নির্মাণকাজ করতেন তিনি। ট্রাক, চালক, গ্রাহক, অর্থ পরিশোধ থেকে শুরু করে পণ্য পৌঁছে দেওয়া ব্যবসার প্রায় প্রতিটি কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন প্যাটেল।

হাজিরায় ইট পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাটিও ওই সময়ের। তবে ব্যবসার প্রথম কয়েক মাসেই তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে বুঝতে পারেন, ব্যবসার এই মডেল তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করা হয়ে গেলেও শুধু সেই কারণে ব্যবসাটি চালিয়ে যাওয়ার বদলে তিনি অংশীদারের কাছে ট্রাক ও ব্যবসার সম্পদ তুলে দেন এবং আরও পরিকল্পিত করপোরেট প্রতিষ্ঠান গড়তে সুরাটে ফিরে আসেন।

তার মতে, কোনও একটি ব্যবসায় আটকে থাকাই অধ্যবসায় নয়। পরিস্থিতি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে উদ্যোক্তাকে দিক পরিবর্তনের মানসিকতা রাখতে হয়। এরপর ভারতের দ্রুত সম্প্রসারিত মোবাইল যোগাযোগ খাতে সুযোগ দেখেন প্যাটেল। কেপি গ্রুপ টেলিকম অবকাঠামো খাতে প্রবেশ করে এবং ১৬টি রাজ্যে প্রায় ১৩ বছর মোবাইল টাওয়ার অবকাঠামো নিয়ে কাজ করে।

একাধিক মোবাইল অপারেটরকে আলাদা আলাদা টাওয়ার নির্মাণের বদলে একই অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ দিতে শেয়ার্ড-টাওয়ার মডেল নিয়েও কাজ করেন তিনি। টেলিকম খাতের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে ব্যবসা বাড়তে থাকে। তবে পরবর্তী সময়ে ২জি স্পেকট্রাম বিতর্কের পর খাতটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তখন আবার নতুন সুযোগের সন্ধানে নামেন প্যাটেল।

এবার তার নজর পড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে। গুজরাটের চারাঙ্কায় ১০৫ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ পার্কের কাজে যুক্ত হওয়ার সময় সৌরবিদ্যুৎকে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করেন তিনি। এর আগে তার ব্যবসার বড় অংশ ছিল অন্য প্রতিষ্ঠানের জন্য কিছু নির্মাণ করা বা পরিবহন করা। সৌরবিদ্যুৎ তাকে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো জ্বালানি সম্পদের মালিকানা ও পরিচালনার সুযোগ করে দেয়।

প্যাটেল বলেন, সৌর প্যানেল প্রায় ২৫ বছর স্থায়ী হয় এবং দীর্ঘ সময় নিশ্চিত আয় দিতে পারে এমন ধারণা থেকেই সৌর খাতে তার আগ্রহ তৈরি হয়। একই সঙ্গে এটি পরিবেশগত স্থায়িত্বেও ভূমিকা রাখে। ২০০৮ সালে তিনি কেপিআই গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে কেপিআই গ্রিন এনার্জি নামে পরিচিত। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কেপি এনার্জি।

সেই সময় সৌরবিদ্যুৎ খাত আজকের মতো পরিচিত ছিল না। ফলে প্যাটেলের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তার বন্ধু ও আত্মীয়দের অনেকে উপহাসও করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, সৌর খাতে প্রবেশ করে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঝুঁকি নিচ্ছেন।

তবে সেই সমালোচনা তাকে থামাতে পারেনি। নতুন ব্যবসায় জমি, মূলধন, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প এবং তখনও বিকশিত হতে থাকা বাজারের অর্থনীতি সবকিছু নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হয়েছে তাকে। প্রায় ১ লাখ রুপি, একটি ছোট অফিস এবং ট্রাক ও মালামাল পরিবহননির্ভর ব্যবসা দিয়ে শুরু করেছিলেন ফারুক প্যাটেল। তিন দশকের বেশি সময় পর সেই উদ্যোগের বিস্তৃত রূপ তিনটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ও ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলা একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী।

সূত্র: এনডিটিভি