২০ কোটি বছর পর ‘বিলুপ্ত’ হবে মানবজাতি, দায়ী হবে নতুন সুপারকন্টিনেন্ট

পৃথিবীর সবকটি মহাদেশ একদিন আবার একসঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বিশাল ‘সুপারকন্টিনেন্ট’ বা অতি-মহাদেশ গঠন করবে- বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে এটি বলে আসছেন। প্যানজিয়া মহাদেশ ভেঙে পৃথিবীর বর্তমান রূপ তৈরি হয়েছিল এবং প্রায় ২০০ মিলিয়ন বা ২০ কোটি বছর পর গ্রহটি আবার সেই অবস্থায় ফিরে যাবে। তবে এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের বিভিন্ন সম্ভাবনার মধ্যে একটি পরিস্থিতি পৃথিবীর মানুষসহ সব স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

২০১৮ সালে জিওলজিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই পরিস্থিতি তৈরির চারটি সম্ভাব্য উপায়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে:

১. নভোপ্যানজিয়া:

এ ক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগর সংকুচিত হয়ে বন্ধ হয়ে যাবে এবং আটলান্টিক মহাসাগর প্রসারিত হবে। আমেরিকা মহাদেশ পূর্ব এশিয়া ও অ্যান্টার্কটিকার সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে একটি ভূখণ্ড তৈরি করবে, যার কেন্দ্র থাকবে মূলত উত্তর গোলার্ধে। বিষুবরেখার নিকটের এলাকাগুলো উষ্ণ ও শুষ্ক হলেও উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে। তবে ভূখণ্ডটি শীতল অক্ষাংশের দিকে প্রসারিত হওয়ায় সমুদ্র প্রবাহ ও মেরু অঞ্চলের বরফপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে।

২. অরিকা:

পর্তুগালের বিশ্ববিদ্যালয় অব লিসবনের টেকটোনিক্সের সহকারী অধ্যাপক জোয়াও সি. দুয়ার্তে নির্মিত এই অনুমান অনুযায়ী, প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগর উভয়ই বন্ধ হয়ে যাবে এবং মহাদেশগুলোর ভেতরের অংশ ভেঙে গিয়ে বিষুবরেখাকে ঘিরে একটি বলয় তৈরি করবে। দুয়ার্তে জানান, এটি বিষুবরেখার কাছে অবস্থিত হওয়ায় বর্তমান পৃথিবীর চেয়ে কিছুটা উষ্ণ ও শুষ্ক হতে পারে।

৩. আমাসিয়া:

এই পরিস্থিতিতে আর্কটিক বা উত্তর মহাসাগর বন্ধ হয়ে যাবে এবং অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া সব মহাদেশ উত্তর মেরুর দিকে সরে যাবে। ফলে দক্ষিণ গোলার্ধ একটি বিশাল মহাসাগরে পরিণত হবে। মাঝে কোনও ভূখণ্ড না থাকায় বিষুবরেখা থেকে মেরুতে তাপ বহনকারী সামুদ্রিক প্রবাহ ব্যাহত হবে, যা মেরু অঞ্চলকে সারা বছর বরফাচ্ছন্ন ও অতিমাত্রায় শীতল করে রাখবে।

৪. প্যানজিয়া আলটিমা বা প্রক্সিমা:

এই প্রক্রিয়ায় আটলান্টিক মহাসাগর সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে এবং ভারত মহাসাগরও বন্ধ হয়ে একটি অভ্যন্তরীণ সাগরে পরিণত হবে। আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশের সংঘর্ষের মাধ্যমে সব মহাদেশ বিষুবরেখার চারপাশে একত্র হয়ে একটি রিং বা বলয় আকৃতির বিশাল ভূখণ্ড গঠন করবে।

মানবজাতির জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ কোনটি?

বিজ্ঞানীদের মতে, অরিকা বা আমাসিয়ার কারণে নির্দিষ্ট কিছু স্থল ও সামুদ্রিক প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটলেও, প্যানজিয়া আলটিমা পরিস্থিতি পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতির ধ্বংসের কারণ হতে পারে।

প্যানজিয়া আলটিমার অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলো মহাসাগরের বাতাস থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করবে। ফলে মোট ভূখণ্ডের ৯০ শতাংশই উত্তপ্ত ও শুষ্ক মরুভূমিতে পরিণত হবে। এর সঙ্গে সূর্যের উজ্জ্বলতা ও উত্তাপ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি টেকটোনিক প্লেটের স্থানান্তরের কারণে ধারাবাহিক আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটবে, যা বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেবে।

এ সময় পৃথিবীর তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যাবে। সমগ্র পৃথিবীর মাত্র ৮ থেকে ১৬ শতাংশ এলাকা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বসবাসের যোগ্য থাকবে। প্রচণ্ড তাপ ও বাতাসহীন পরিস্থিতির কারণে মানবদেহ অতিরিক্ত উত্তাপ বের করতে পারবে না, যা স্তন্যপায়ী জীবনের সহনশীলতার তাপীয় সীমা পার করে দেবে এবং এক মহাবিলুপ্তি ঘটাবে।

তবে স্বস্তির বিষয় হলো, আগামী ২০ কোটি বছরের মধ্যে এই ঘটনাটি ঘটার কারণে বর্তমান মানবজাতির কাউকে এই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে না। তাছাড়া ওই সময় নাগাদ নতুন বৈরী পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এমন কোনও নতুন প্রজাতির মাধ্যমে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। 

সূত্র: উইয়ন নিউজ