রাশিয়ার সেনাবাহিনী কি ন্যাটোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত?

ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক স্তরে যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে তা রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে ভবিষ্যৎ সংঘাতের আশঙ্কাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। শীতল যুদ্ধের পর থেকে এমন উত্তেজনা আর দেখা যায়নি। ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়া পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েছে এবং যুদ্ধ শিগগিরই থামার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তবে রাশিয়া কি এ থেকে শিক্ষা নিয়ে সেনাবাহিনীকে উন্নত করতে পেরেছে? তারা কি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক জোট ন্যাটোর বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত? কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

রাশিয়ার সেনাবাহিনী: উন্নয়ন ও সীমাবদ্ধতা

ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার স্থলবাহিনীর দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। কিন্তু সংখ্যার এই বৃদ্ধি প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণ করতে পারেনি। যুদ্ধক্ষেত্রে সংখ্যা দিয়ে মানের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। রাশিয়ার জন্য যুদ্ধ জয়ের একমাত্র উপায় হলো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করা। রাশিয়া শুরুতে যেসব ভুল করেছিল, সেগুলো থেকে কিছু শিক্ষা নিয়েছে। তারা বুঝেছে যে, নিম্নমানের সেনাদের আক্রমণের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং তাদের প্রতিরক্ষার কাজে লাগানো যেতে পারে।

রাশিয়া এখন সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কাঠামো থেকে সরে এসে ডিভিশন কাঠামো গ্রহণ করছে। কারণ একটি ব্রিগেডের তুলনায় ডিভিশন বড় হওয়ায় তারা বেশি ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে পারে। এর ফলে যুদ্ধের মাঠে তারা বেশি সময় টিকে থাকতে পারে। রাশিয়ার সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এই শিক্ষাগুলো কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠন করছেন।

রাশিয়ার মেরিন বাহিনী পাঁচটি ব্রিগেড থেকে পাঁচটি ডিভিশনে বাড়ানোর কাজ চলছে, যার মানে প্রায় ৭৫ হাজার সেনা। এই সেনাদের উন্নত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। বিশেষ করে মেরিন, বিমানবাহিনী ও স্পেৎসনাজ বিশেষ বাহিনীকে ভালো প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে।

ট্যাংকের ব্যবহার: পুরনো ও নতুন মডেল

যুদ্ধের আগে অনেকেই ভাবছিল ট্যাংকগুলো পুরনো হয়ে গেছে এবং আধুনিক যুদ্ধে তেমন কার্যকর নয়। কিন্তু ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয়েই যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ট্যাংকের ওপর নির্ভর করেছে। যদিও ড্রোন, মাইন ও বিমানবাহিনীর অক্ষমতার কারণে উভয় পক্ষই অনেক ট্যাংক হারিয়েছে। ইউক্রেনের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়া ৮ হাজার ট্যাংক হারিয়েছে। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ৫০০ ট্যাংক তৈরি করতে সক্ষম। যদিও এর বড় অংশ পুরনো মডেলগুলোর পুনর্নির্মাণ।

রাশিয়া নতুন টি-৯০ মডেলের ট্যাংক উৎপাদন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু উৎপাদনের গতি অনেক ধীর। এর ফলে, রাশিয়ার সামনের সারির সেনারা এখন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরনো ট্যাংক নিয়ে যুদ্ধে নামছে। এটি রাশিয়ার সামরিক শক্তির অন্যতম দুর্বল দিক হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

সামরিক উদ্ভাবন: ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ

যদিও রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জামে ঘাটতি রয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে তারা অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে ড্রোনের ব্যবহার রাশিয়া ভালোভাবে রপ্ত করেছে। বিভিন্ন আকার ও ধরনের ড্রোন এখন ২১ শতকের যুদ্ধে অপরিহার্য। ড্রোনের মাধ্যমে ইউক্রেনের সামরিক অবস্থান সম্পর্কে আগাম তথ্য পেয়ে রাশিয়া আগেভাগেই প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারছে।

রাশিয়ার ইলেকট্রনিক যুদ্ধের ইউনিটগুলো ইউক্রেনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করতে সফল হয়েছে। তারা ইউক্রেনের ড্রোন ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করছে এবং ইউক্রেনীয় সেনাদের তথ্য সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরনের কার্যক্রম রাশিয়াকে কৌশলগতভাবে এগিয়ে রেখেছে। তবে আকাশে তাদের দুর্বলতা এখনও বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।

দুর্বল বিমান বাহিনী

রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অংশ হলো বিমান বাহিনী। যুদ্ধের সময় তারা ধারাবাহিকভাবে খারাপ নৈপূণ্য দেখিয়েছে। রাশিয়ার বিমান বাহিনী মূলত স্থলবাহিনীর সহযোগিতার জন্য প্রশিক্ষিত, কৌশলগত আক্রমণের জন্য নয়। যুদ্ধের প্রথম দিকে তারা ইউক্রেনের বিমানবন্দর, গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার ও রাডার সাইটগুলো ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়।

অন্যদিকে, পশ্চিমা বিমান বাহিনী কৌশলগতভাবে শত্রুর মূল অবস্থানগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম, যা যুদ্ধে একটি বড় পার্থক্য সৃষ্টি করে। যুদ্ধের শুরুতেই পশ্চিমা বাহিনী শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলো ধ্বংস করে তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করতে পারে। রাশিয়া এরকম কার্যক্রমে অক্ষম হওয়ায়, তারা দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

নৌবাহিনী: আংশিক শক্তি

রাশিয়ার নৌবাহিনী ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। তাদের কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহরের বেশ কয়েকটি জাহাজ ও সাবমেরিন ধ্বংস হয়েছে, সদর দফতর আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং কমান্ডার নিহত হয়েছেন। তবে উত্তর ও পূর্বের বন্দরগুলোতে অবস্থানরত রাশিয়ার নৌবাহিনী এখনও নিরাপদে আছে এবং রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম। রাশিয়ার সাবমেরিন বাহিনী এখনও শক্তিশালী এবং নতুন ও উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থার সঙ্গে সজ্জিত হচ্ছে।

যুদ্ধ অর্থনীতি ও মিত্রদের সাহায্য

রাশিয়া যুদ্ধের আগে যে বাজেট নিয়ে চলছিল, তা এখন দ্বিগুণ হতে চলেছে। ২০২৫ সালে তাদের সামরিক বাজেট ১৪২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। এই বাজেট রাশিয়াকে যুদ্ধের জন্য ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করতে সহায়তা করছে, যদিও তারা ক্ষতি পূরণ করতে পারছে না। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার সামরিক শিল্পে উচ্চ প্রযুক্তির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় চিপগুলো পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই ঘাটতি পূরণের জন্য রাশিয়া তাদের মিত্রদের ওপর নির্ভর করছে। ইরান তাদের দূরপাল্লার ড্রোন সরবরাহ করছে, আর উত্তর কোরিয়া গোলাবারুদ ও ছোট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে। তবে, রাশিয়ার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করা সত্ত্বেও, সামরিক সরঞ্জামের মান ও উৎপাদনের পরিমাণে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। রাশিয়ার অর্থনীতি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।

ন্যাটো: রাশিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

যদিও রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তারা এখনও ন্যাটোর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো অবস্থায় নেই। রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে ন্যাটো পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং তাদের সদস্যদের প্রতিরক্ষা বাজেটও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্র উৎপাদনের হারও বেড়েছে। এই প্রস্তুতি ন্যাটোকে যে কোনও বড় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তুলছে।

ন্যাটোর সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও সরঞ্জামের মান রাশিয়ার চেয়ে অনেক ভালো। দীর্ঘদিন ধরে যৌথ মহড়া এবং সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ন্যাটো দেশগুলোর কমান্ড এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বিশাল অগ্রগতি হয়েছে। ন্যাটোর বিমান বাহিনী কৌশলগতভাবে যে কোনও প্রতিপক্ষকে দৃষ্টিশক্তিহীন এবং অক্ষম করতে সক্ষম, যা রাশিয়ার বিমান বাহিনী করতে পারে না।

সামগ্রিকভাবে, রাশিয়ার সামরিক বাহিনী বর্তমানে ন্যাটোর সঙ্গে একটি সরাসরি সংঘাতে টিকে থাকার মতো অবস্থায় নেই।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

যুদ্ধের একটি বিরতি রাশিয়াকে পুনরায় সজ্জিত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে। তাদের সামরিক বাজেট আবারও বাড়ানো হবে এবং তাদের সশস্ত্র বাহিনী পুনর্গঠিত হবে। তবে রাশিয়া যদি ন্যাটোর বিরুদ্ধে নতুনভাবে আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটা হবে একটি বিপজ্জনক ভুল। অতীতে রাশিয়া যেমন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে ভুল করে ছিল, ঠিক তেমনি আবারও এমন ভুল হতে পারে।

এর ফলে, ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর দুর্বলতা আবারও সামনে চলে আসতে পারে।