ইউক্রেনে যুদ্ধ থামানোর বিনিময়ে পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটোর সম্প্রসারণ বন্ধের লিখিত প্রতিশ্রুতি ও কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্ত দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বিষয়টি জানিয়েছেন আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত তিন রুশ সূত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পুতিনের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে বলছেন, কিয়েভের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অনাগ্রহ দেখিয়ে ‘আগুন নিয়ে খেলছেন’ রুশ নেতা।
গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে দুই ঘণ্টার বেশি সময় কথোপকথনের পর পুতিন জানান, ইউক্রেনের সঙ্গে একটি শান্তি সমঝোতা নিয়ে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন তিনি। রাশিয়া বর্তমানে সেই সমঝোতার খসড়া তৈরি করছে। তবে এর জন্য কত সময় লাগবে, তা বলা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনটি সূত্র জানায়, ইউক্রেন, জর্জিয়া ও মলদোভাকে ন্যাটো সদস্যপদ থেকে বাদ দেওয়ার নিশ্চয়তা চাচ্ছেন পুতিন। পাশাপাশি ইউক্রেনকে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ, রুশ ভাষাভাষীদের সুরক্ষা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কিছু অংশ প্রত্যাহারসহ রাশিয়ার জব্দকৃত সার্বভৌম সম্পদের বিষয়ে নিষ্পত্তি চান তিনি।
সূত্রগুলোর একজন বলেন, পুতিন শান্তি চান, কিন্তু যেকোনও মূল্যে নয়। ওই সূত্রের মতে, নিজের শর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব না হলে ইউরোপ এবং কিয়েভকে সামরিক অগ্রগতির মাধ্যমে দেখাতে চান পুতিন যে ভবিষ্যতের শান্তি হবে আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল।
ক্রেমলিন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও আগেও বহুবার বলেছে, ইউক্রেন যুদ্ধের মূলে রয়েছে ন্যাটো সম্প্রসারণ ও পশ্চিমাদের সহযোগিতা।
অন্যদিকে ইউক্রেন জানিয়ে এসেছে, ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাশিয়া ঠেকাতে পারবে না। দেশটি পশ্চিমা নিরাপত্তা গ্যারান্টি ছাড়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ আক্রমণ ঠেকাতে পারবে না বলেও মত দিয়েছে কিয়েভ।
ন্যাটোও পূর্বে বলেছে, তাদের ‘ওপেন ডোর পলিসি’ রাশিয়ার দাবির জন্য বন্ধ করা হবে না। জোটটি এখনও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও মন্তব্য করেনি।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আক্রমণ চালায় রাশিয়া। ডনবাসে আট বছরের সংঘর্ষের পর ওই যুদ্ধ শুরু হয়। রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও এই যুদ্ধ দুই দেশের জন্যই রক্তক্ষয়ী ও ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে রয়টার্স জানিয়েছিল, যুদ্ধকালীন রুশ অর্থনীতিতে শ্রমঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদের হারসহ নানা চাপ তৈরি হয়েছে, যা পুতিনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, রুশ সেনারা যদি যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত অগ্রগতি পায়, তাহলে পুতিন আরও আগ্রাসী হতে পারেন। আর ভূখণ্ড নিয়ে তিনি আগের তুলনায় এখন আরও অনমনীয় অবস্থানে রয়েছেন।
২০০৮ সালের বুখারেস্ট সম্মেলনে ন্যাটো জানিয়েছিল, ভবিষ্যতে ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে সদস্যপদ দেওয়া হবে। এর পর ২০১৯ সালে ইউক্রেন নিজেদের সংবিধানে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্যপদের লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করে।
ট্রাম্প এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ চাওয়াই যুদ্ধের পেছনে একটি বড় কারণ। তিনি মনে করেন, ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্যপদ পাবে না।
রাশিয়া চায়, এ বিষয়ে পশ্চিমারা লিখিত প্রতিশ্রুতি দিক। পুতিন মনে করেন, ১৯৯০ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার সোভিয়েত নেতাদের মৌখিকভাবে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, ন্যাটো পূর্বদিকে বাড়বে না। যদিও তা কখনও লিখিতভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
ন্যাটো অবশ্য দাবি করে, তাদের উপস্থিতি রাশিয়ার জন্য হুমকি নয়। তবে ২০২২ সালে জোটটি রাশিয়াকে ইউরোপ-আটলান্টিক অঞ্চলের জন্য ‘সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সরাসরি হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করে। রুশ আগ্রাসনের জবাবে ২০২৩ সালে ফিনল্যান্ড ও ২০২৪ সালে সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে। পশ্চিমা নেতারা বারবার বলেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়া জয়ী হলে একদিন ন্যাটোভুক্ত দেশে আক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। রাশিয়া অবশ্য এসব সতর্কতাকে ‘ভীতির প্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৩ সালের জুনে পুতিন জানান, যুদ্ধ থামাতে ইউক্রেনকে ন্যাটো থেকে সরে আসতে হবে এবং রাশিয়া যে চারটি অঞ্চল দাবি করেছে, সেখান থেকে ইউক্রেনকে সেনা সরাতে হবে।
এই অঞ্চলগুলো হলো লুহানস্ক, ডনেস্ক, জাপোরিজ্জিয়া ও খেরসন। এর বাইরে খারকিভ ও সুমি অঞ্চলের কিছু অংশ এবং দিনিপ্রোপেট্রভস্কেও রুশ সেনারা হুমকি দিচ্ছে।
পশ্চিমারা এটিকে ‘ভূমি দখলের সাম্রাজ্যবাদী প্রচেষ্টা’ বললেও পুতিন এটিকে দেখেন ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার অপমানজনক অবস্থার পরিবর্তন এবং পশ্চিমা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে।
এখন পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের কোনও বাস্তবসম্মত লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং শান্তি আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল ও চাপের রাজনীতি আরও তীব্র হয়ে উঠছে।