২৯ বছর বয়সী দেবাঞ্জন দেব একজন আইএএস কর্মকর্তা। কলকাতা পৌরসভায় এক বছর ধরে যুগ্ম কমিশনার পদে কর্মরত। করোনা মহামারিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন তিনি। দুর্গাপূজায় দরিদ্রদের বস্ত্র বিতরণ থেকে শুরু করে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের সভাপতির কাছে জরুরি সরবরাহ পৌঁছে দেওয়াতে জড়িয়ে আছে তার নাম।
দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রকোপ যখন চরমে দেবাঞ্জন শহরে আয়োজন করেন টিকাদান কর্মসূচি। ২১ জুন তিনি যাদবপুর থেকে নির্বাচিত তৃণমূল এমপি মিমি চক্রবর্তীকে তার পরিচালিত একটি কেন্দ্র থেকে টিকা নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। তৃতীয়লিঙ্গের মানুষ ও প্রতিবন্ধী শিশুদের কলকাতার কসবায় এই টিকাদান ক্যাম্প আয়োজন করা হয়।
কসবায় চারতলা বাড়ির তিনতলায় ফ্ল্যাট নিয়ে ‘পৌরসভা’ বানিয়েছিলেন দেবাঞ্জন। তিনি যাতায়াত করতেন শোফার-চালিত এসইউভি কারে। এতে জ্বলত নীল বাতি ও ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারের’ একটি ভুয়া প্লেট। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত প্রতিবেশীরা আইএএস কর্মকর্তা হিসেবে দেবের অর্জনে গর্ববোধ করতেন।
উপরে যা পড়েছেন এতক্ষণ তার সবই মিথ্যা। দেবাঞ্জন কোনও আইএএস কর্মকর্তা নন। তিনি আইএএস কর্মকর্তার ছদ্মবেশ ধারণ করেছেন। টিকাদান ক্যাম্পে ইনজেকশনে যা দেওয়া হয়েছে তাতে টিকা ছিল না। ধারণা করা হয়, অন্তত ১৫০০ মানুষকে ভুয়া করোনা টিকা দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার দাবি করছে, দেবের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তাদের কোনও ধারণা নাই। ২১ জুনের পর থেকে তিনটি সংবাদ সম্মেলন করা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টি নিয়ে টু শব্দ করেননি।
কলকাতা পৌরসভার যে যুগ্ম কমিশনার পরিচয় দিচ্ছিলেন দেবাঞ্জন দেব সেই পদটি প্রায় দশ বছর আগে বাতিল করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই ভুয়া পদ নিয়ে দেবাঞ্জন এতগুলো টিকাদান শিবিরের নামে প্রতারণা করলেন, অথচ পৌরসভা জানতে পারল না কেন?
যদিও কলকাতা পৌরসভার তরফে জানা গেছে, দেবাঞ্জন দেব নামে একজন ব্যক্তি যে ভুয়া পরিচয়পত্র দেখিয়ে নিজেকে যুগ্ম কমিশনার বলে দাবি করছেন সেকথা ১৩ জুন জানতে পারেন পৌরসভার কমিশনার বিনোদ কুমার। এরপর পুলিশে অভিযোগ করেন তিনি। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
পৌরসভার যুগ্ম কমিশনার পরিচয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে তাদের কাজের বরাত পাইয়ে দিয়ে নিজে সাব ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবেন বলে তাদের জানিয়েছিলেন দেবাঞ্জন। ঠিকাদারদের ঠকিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা হাতানোর অভিযোগও উঠেছে দেবাঞ্জনের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, সহযোগী শান্তনু মান্না, তালতলায় দেবাঞ্জনের ওষুধের গোডাউনের দেখাশোনার কাজ করতেন। সুশান্ত দাস, রবিন শিকদার পৌরসভার কর্মকর্তার নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে দেবাঞ্জনকে সাহায্য করেন। কলকাতা পৌরসভার ১৪৪টি ওয়ার্ডে স্যানিটাইজার সরবরাহের নাম করে একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার থেকে ৪ লাখ রুপি হাতিয়ে নেন দেবাঞ্জন দেব। সেই টাকা জমা পড়ে বেসরকারি ব্যাংকের কসবা শাখায় কলকাতা পৌরসভার নামে খোলা অ্যাকাউন্টে। যদিও শেষ পর্যন্ত কাজটি পায়নি ওই সংস্থা।
গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, কলকাতা পৌরসভায় চাকরি দেওয়ার নাম করে বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণীর নিয়োগ পরীক্ষা নিয়েছিলেন দেবাঞ্জন। এমনকী তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ নথি। কিন্তু সেই পরীক্ষার ফল আজও প্রকাশিত হয়নি। ইতোমধ্যে সেই অভিযোগ জমা পড়েছে পুলিশের কাছে।
গোয়েন্দাদের এমন অভিযোগের সত্যতা উঠে আসছে জ্যেঠতুতো ভাই কাঞ্চন দেবকে পৌরসভা কর্মী হিসেবে দেবাঞ্জনের নিজের অফিসে নিয়োগের ঘটনায়।
কাঞ্চনবাবুর দাবি, ‘নিয়ম মেনে পরীক্ষা নিয়ে আমাকে পৌরসভার কর্মী বলে নিয়োগ করেছিল দেবাঞ্জন। দেওয়া হয়েছিল নিয়োগপত্রও। দফতরের কন্ট্রোলিং অফিসারের পদ দেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই ছিল না। প্রতি মাসে বেতন জমা পড়ত কলকাতা পৌরসভার অ্যাকাউন্ট থেকে। তাই চাকরির বৈধতা নিয়ে কখনও প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু আমাকে দেওয়া হয়নি কোনও পরিচয়পত্র। অথচ দেবাঞ্জন যাদের দ্বারা পরিবেষ্ঠিত থাকত তাদের সবার কাছে পরিচয়পত্র ছিল। অফিসের মধ্যে সব সময় চাপের পরিস্থিতি বজায় থাকত। যার জেরে বেশ কয়েকবার পদত্যাগ করতে যাই আমি। একবার এক কর্মীকে ডায়মন্ড হারবার নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ শুনেছি। এ ব্যাপারে আমাকে মুখ খুলতে নিষেধ করেন দেবাঞ্জনের ঘনিষ্ঠরা। আমি কেন, দফতরের আরও ১০-১২ জন কর্মীর কেউই বুঝতে পারেননি দেবাঞ্জন ভুয়া কর্মকর্তা।’
এদিকে, বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তা ও রাজনীতিকদের সঙ্গে দেবাঞ্জনকে ছবিতে দেখা যাচ্ছে। ওইসব কর্মকর্তা ও রাজনীতিকদের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল দেবাঞ্জনের, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেবাঞ্জনের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছেন ক্ষমতাসীন তৃণমূলের দুই এমএলএ ও একজন এমপি।
অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন কলকাতা পৌরসভা নির্বাচনে শাসকদলের পক্ষ প্রার্থী হওয়া দেবাঞ্জনের লক্ষ্য ছিল। সেই কারণে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজ করে নিজের পরিচিতি বাড়ানোর উদ্যোগ ছিল তার।