ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনের দিন ঘোষণা হওয়ার পর থেকে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে হতাহতের খবর আসছে। বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনেও গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন চারজন। পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রথম দিন গত ৯ জুনও একজন নিহত হয়। সেদিন মুর্শিদাবাদ জেলার খরগ্রাম থানার রতনপুর নলদীপ গ্রামের ফুলচাঁদ শেখ নামে এক কংগ্রেসকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
শুরু থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন জেলায় পঞ্চায়েতের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার (১৫ জুন) ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন।এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম। রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে তিনি বলেছেন, ‘তাহলে কি গোটা রাজ্যকে স্পর্শকাতর বলে ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার নির্দেশ দেব? সেটা ভালো হবে?’ এরপরেই পঞ্চায়েতে ভোট নিয়ে বড় ধাক্কা রাজ্য নির্বাচন কমিশনের। গোটা রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী আনার নির্দেশ দিলো কলকাতা হাইকোর্ট।
এদিন উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায় বিডিও অফিসে মিছিল করে মনোনয়ন জমা দিতে যাওয়ার পথে গুলি চালানো হয়। সে সময় গুলিবিদ্ধ হয় তিনজন। এদের মধ্যে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। কাঠালবাড়ি কলোনি এলাকায় বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের কর্মীরা মিছিল করে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার জন্য চোপড়ার ব্লক ডেভলপমেন্ট অফিসের (বিডিও) দিকে আসছিলেন। আচমকা তাদের লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। আতঙ্কে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান মিছিলে থাকা বাম ও কংগ্রেসের কর্মীরা। সে সময় গুলিতে জখম হন বেশ কয়েকজন বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের কর্মী। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনজনকে ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাদের মধ্যে দু’জন কর্মীর মৃত্যু হয়।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মোহাম্মদ নজরুল ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বলেন, আমরা দল বেঁধে বিডিও অফিসে মনোনয়ন জমা দিতে যাচ্ছিলাম। তৃণমূল কংগ্রেস আমাদের ওপর হামলা চালায়। তারা ২৫ থেকে ৩০ জন ছিল। তারা মনোনয়নপত্র জমা দিতে মানা করছিল। আমাকে গুলি করলো, আমার ভাতিজাকেও গুলি করেছে। তাদের সঙ্গে বড় লম্বা বন্দুক ছিল। তা দিয়েও মারধর করছিল।
গুলিতে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ঘটনাস্থলে পৌঁছায় উত্তর দিনাজপুর জেলার বিশাল পুলিশ বাহিনী। টহলদারি চলছে পুরো এলাকায়।
অপরদিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে গুলিতে মৃত্যু দুজনের। একজন আইএসএফ কর্মী, অন্যজন তৃণমূল কর্মী। আইএসএফ কর্মীর নাম মহিউদ্দিন মোল্লা। কাশীপুর জয়পুরের বাসিন্দা তিনি। এদিন মনোনয়ন পত্র দাখিল করতে আসার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন বলে খবর।
ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি জানান, আমরা মনোনয়ন পত্র জমা দেবোই। সকাল ১০টায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। গোলাগুলি চলছে। ১৫-২০ জন হাসপাতালে ভর্তি। আমাদের তিনটে ছেলে মারা গেছে। পুলিশ গুলি করেছে। তারা আইএসএফের কর্মী। তৃণমূলের লোকজন এসব করছে।’ অন্যদিকে ভাঙড়ের সহিংতরায় মারা গেছেন তৃণমূল কর্মী রশিদ মোল্লা।
বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমাদের নমিনেশন ফাইল করতে দিতে হবে। যে এলাকায় উনিশ এবং একুশে বিজেপি লিড পেয়েছে সেই এলাকায় প্রার্থী পাওয়া যাবে না এটা হতে পারে না। প্রথমদিন থেকে ইন্দাস, সন্দেশখালি ১, সন্দেশখালি ২, মিনাখাঁ, ভাঙড়, ক্যানিংসহ গোটা রাজ্যের পঞ্চাশের বেশি ব্লকে লুঠ করছে গুণ্ডারা। তাই গণতন্ত্র বাঁচাতে আমাদের লড়াই চলছে। আমরা হাইকোর্টে গিয়েছি ক্ল্যারিফিকেশনের জন্য। এবং আমরা এটাও বলছি যারা মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন তারা নির্বাচন কমিশনে আসুন। পুলিশ আপনাদের আটকাতে পারবে না। যে লড়তে চায় তাকে সুযোগ দিতেই হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লুঠ করতে দিচ্ছি না, লুঠ করতে দেব না। এটা আমাদের চ্যালেঞ্জ, এটা আমরা করে দেখাব।’
ইতোমধ্যে সন্ত্রাসের অভিযোগ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে বিজেপি। বৃহস্পতিবারই নির্বাচন কমিশনেও যাচ্ছে বিজেপির প্রতিনিধি দল। মনোনয়ন পেশকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বৃহস্পতিবার বিকেলে বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের সঙ্গে অমিত শাহের কথা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, সারা রাজ্যেই এই চেহারা। পুলিশের ভূমিকা হলো শাসকদলের পা চাটা। চোপড়াতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বিরোধী জোটের দু'জন। ভাঙড়ে মারধর করেছে। বিডিও দলের ভেতরে তৃণমূলের লোকজন বসে রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় গ্রামে আটকে দেওয়া হচ্ছে সিপিএম প্রার্থীদের।
কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী বলেন, এটা খুনি তৃণমূলের আক্রমণ। এর সূচনা আগেই হয়েছে। এই চোপড়াতেই দশ জন কংগ্রেস নেতাকে অপহরণ করা হয়। একটা স্কুলে আটকে রাখে এই তৃণমূল। পুলিশের মদতে ওরা অপরহরণ করছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, ১৩ তারিখ পর্যন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রায় দু’হাজার জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দেড় হাজার জনের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় অভিযোগ রয়েছে। জায়গায় জায়গায় বিক্ষিপ্ত সহিংসতার যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে, তাতে ১৩ তারিখের রিপোর্ট অনুয়ায়ী ৬২ জন আহত হয়েছেন বলে কমিশন সূত্রে খবর। এর পাশাপাশি প্রায় চার হাজার জনের অস্ত্র লাইসেন্স জমা নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। যেসব জায়গাগুলোতে সহিংসতার অভিযোগ উঠে আসছে, সেই সব জায়গাগুলোতে আরও সজাগ নজর রাখছে রাজ্য নির্বাচন কমিশন।