যে কারণে পদত্যাগ করলেন ভারতের উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়

সময়ের আগেই পদত্যাগ করলেন ভারতের ১৪তম উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়। সোমবার (২১ জুলাই) রাতে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন তিনি। রাজ্যসভার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে তার ভূমিকা তাকে পরিচিত করেছিল এক স্পষ্টবাদী নেতারূপে। দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে তার মেয়াদজুড়ে বিরোধীদের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং বিচার বিভাগের প্রতি বিচ্ছিন্ন ক্ষমতার প্রশ্নে তার কড়া মন্তব্য ছিল নিয়মিত ঘটনা। ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ খবর জানিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে লেখা পদত্যাগপত্রে ধনখড় জানিয়েছেন, তাঁর পদত্যাগ তৎক্ষণাৎ কার্যকর হবে এবং তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

সোমবারই শুরু হয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। পদাধিকারবলে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। সোমবার বেলা ১১টার সময় যথারীতি তিনি রাজ্যসভায় আসেন। সভার কাজও শুরু করেন। শুরু থেকেই বিরোধীরা পেহেলগাম–কাণ্ড ও অপারেশন সিঁদুর নিয়ে আলোচনার দাবি জানাতে থাকেন। উপরাষ্ট্রপতি বিরোধী নেতা কংগ্রেসের মল্লিকার্জুন খাড়গেকে দাবির সমর্থনে কথা বলার সুযোগও করে দেন। তারপর তিনি বলার সুযোগ দেন সভার নেতা বিজেপির জেপি নাড্ডাকেও। হইচইয়ের মধ্যে চেয়ারম্যান জগদীপ ধনখড় দুপুর ১২টা পর্যন্ত সভার কাজ মুলতবি করে দেন। তারপর তিনি আর সভায় আসেননি। রাতে রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।

৭৪ বছর বয়সী ধনখড় চলতি মাসের শুরুতে বলেছিলেন, তিনি ‘সঠিক সময়েই’ অবসর নেবেন। তবে কংগ্রেস মন্তব্য করেছে, তার পদত্যাগের পেছনে হয়তো আরো কিছু আছে যা সরাসরি দেখা যাচ্ছে না।

পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, ‘আমাদের মহান গণতন্ত্রে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যে অমূল্য অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি অর্জন করেছি, তার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। ভারতের অসাধারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও নজিরবিহীন উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করা এবং তাতে অংশগ্রহণ করতে পারা ছিল এক বিরাট সম্মান। দেশের ইতিহাসের এই রূপান্তরকারী সময়ে সেবা করার সুযোগ পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের।’

রাজস্থানের একটি ছোট গ্রাম কিথানার এক কৃষক পরিবারে জন্ম ধনখড়ের। সেখান থেকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে পৌঁছানোর যাত্রাকে মেধা, দৃঢ়তা ও সংকল্পের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

চিত্তৌড়গড়ের সাইনিক স্কুল এবং পরে রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি রাজস্থান হাইকোর্টে এবং পরে সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

পিভি নরসিমা রাওয়ের আমলে তিনি কংগ্রেসের অংশ ছিলেন, পরে রাজস্থানে অশোক গেহলতের উত্থানের সময় তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। চন্দ্রশেখরের সরকারের সময় তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মন্ত্রীও ছিলেন।

বছরের পর বছর ধরে ধনখড় অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির অধিকার, বিশেষ করে রাজস্থানে জাট সম্প্রদায়কে ওবিসি মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন।

২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে তার অপ্রত্যাশিত নিয়োগ তাকে আবার জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় নিয়ে আসে। তিনি তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক ইস্যুতে—আইনশৃঙ্খলা, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগ নিয়ে—প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তুলেছিলেন।

আইনজীবী থেকে রাজনীতিক হওয়া ধনখড় রাজ্যসভাতেও বিরোধীদের বিভিন্ন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেন, যার জেরে তার অপসারণের প্রস্তাব আনা হয়েছিল। যদিও সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। তবে তিনি প্রথম উপরাষ্ট্রপতি যার বিরুদ্ধে এ ধরনের চেষ্টা করা হয়।

২০২২ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ধনখড় বিরোধী প্রার্থী মার্গারেট আলভাকে পরাজিত করেন। ৭১০টি বৈধ ভোটের মধ্যে তিনি ৫২৮ ভোট পান, যা ৭৪.৩৭ শতাংশ এবং ১৯৯২ সালের পর সর্বোচ্চ ব্যবধানের জয়। তার কার্যকালের মেয়াদ ছিল ২০২৭ সাল পর্যন্ত।