মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যিক আগ্রাসনের ফলে ভারত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হতে পারে। কারণ রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার কারণে ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তিন সপ্তাহের মধ্যে কোনও চুক্তি না হলে ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক ৫০ শতাংশে দাঁড়াবে। বুধবার (৬ আগস্ট) এ–সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে সই করেছেন ট্রাম্প। তবে ২১ দিন পর থেকে এই শুল্ক কার্যকর হবে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় ভারতের হতে অবশ্য বিভিন্ন সম্ভাব্য পদক্ষেপ রয়েছে।
আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা
প্রথম দিকে অনুমান করা হচ্ছিল যে ভারতই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে প্রথম বাণিজ্য চুক্তি করবে। তবে পাঁচ দফা আলোচনার পর আলোচনা ভেস্তে যায়। মূল দ্বন্দ্ব ছিল ভারতের বৃহৎ কৃষি ও দুগ্ধ খাত খোলা এবং রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করা নিয়ে।
ভারত ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, যা দুই দেশের বাণিজ্য কার্যত স্থবির করে দিতে পারে। তবুও, ভারতীয় কর্মকর্তারা আশাবাদী যে, গোপন আলোচনার মাধ্যমে কিছু মতবিরোধ মেটানো যেতে পারে। একটি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দল চলতি মাসেই নয়াদিল্লি সফর করতে পারে।
তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুল্ক বিষয়ে সরাসরি কিছু উল্লেখ না করেই বৃহস্পতিবার বলেন, ‘দেশের কৃষক,দুগ্ধ খাত এবং জেলেদের স্বার্থে কোনও আপস না করার জন্য আমি বড় মূল্য দিতেও প্রস্তুত।’
ভারতীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা কিছু মার্কিন কৃষিপণ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যের (যেমন: বাদাম ও চিজ) জন্য শুল্ক কমাতে রাজি আছেন।
রাশিয়ান তেল আমদানি কমানো
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা দেশ ভারত এর আগে জানিয়েছিল, যদি রাশিয়া থেকে আমদানি অসম্ভব হয়ে পড়ে (অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞার কারণে),তবে তারা বিকল্প উৎস থেকে তেল কিনে নিজেদের চাহিদা মেটাতে পারবে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ভারত খুব কম পরিমাণে রাশিয়ান তেল কিনত। কিন্তু এখন তাদের মোট তেল আমদানির এক-তৃতীয়াংশ আসে রাশিয়া থেকে। কারণ রাশিয়া ভারতের পুরোনো বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা অংশীদার।
রয়টার্স গত মাসে জানিয়েছে,ইন্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্থান পেট্রোলিয়ম, ভারত পেট্রোলিয়ম এবং মাঙ্গালোর রিফাইনারি পেট্রোকেমিক্যাল রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ একদিকে ছাড় কমে এসেছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের চাপ বেড়েছে।
তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, বাজারে রাশিয়ান তেল না থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে।
রাশিয়ার পাশাপাশি, বার্ষিক চুক্তির আওতায়, ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতকে তেল সরবরাহ করে। এর মাধ্যমে ভারত মাসে মাসে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ চাইতে পারে।
তবে ভারত প্রায় ৪০টি দেশ থেকে তেল কেনে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে।
ব্রিকস ও উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া
ভারতের পাশাপাশি ব্রাজিলও ট্রাম্পের শুল্ক নীতির অন্যতম লক্ষ্য। উভয় দেশই ব্রিকস গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ব্রিকসে আরও রয়েছে চীন, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, শুল্কবিরোধ নিয়ে আলোচনা করতে তিনি মোদি, শি জিনপিং এবং অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন। লুলা দ্য সিলভা বর্তমানে ব্রিকস-এর সভাপতি।
ভারতের একজন সরকারি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে মেরামত করতে হবে এবং বাকি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গে একযোগে এগিয়ে যেতে হবে। যেমন: আফ্রিকান ইউনিয়ন ও ব্রিকস সদস্য দেশগুলো।
ভারত ইতোমধ্যেই রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-এর সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মস্কো সফর করেছেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সেখানে যাওয়ার কথা রয়েছে।
রাশিয়া জানিয়েছে, দুই দেশ প্রতিরক্ষা খাতে আরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করেছে।
ভারত চীনের সঙ্গেও যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে, যা ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর এক বিরল পরিবর্তন। মোদি শিগগিরই চীনে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছেন। ২০১৮ সালের পর এটিই তার প্রথম চীন সফর। সেখানে মোদি, পুতিন ও শি জিনপিং একত্রে বৈঠক করতে পারেন। ভারতের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সম্প্রতি চীন সফর করেছেন।
আলোচনা ব্যর্থ হলে ভারতের পরিণতি কী?
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ৮৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে ছিল তৈরি পোশাক, ওষুধ, রত্ন ও গয়না এবং পেট্রোকেমিক্যাল। এই রপ্তানি ভারতের জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ।
যদি প্রস্তাবিত ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়, তাহলে ওষুধ ছাড়া অন্য সব রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ ওষুধে ভিন্ন শুল্ক কাঠামো প্রযোজ্য।
শুধু বাণিজ্য নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে ভিসা এবং আউটসোর্সিং খাতেও।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই টানাপোড়েন প্রযুক্তি পেশাজীবীদের ওয়ার্ক ভিসা এবং বিদেশে সেবা সরবরাহের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারত বহুদিন ধরেই মার্কিন ভিসা প্রোগ্রাম ও সফটওয়্যার/বিজনেস আউটসোর্সিং খাতে উপকৃত হয়ে আসছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষের জন্য চাকরিচ্যুতির কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।