আমেরিকায় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার বছরকয়েক আগেই ভারত-পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশে হামলার পরিকল্পনা করেছিল ওসামা বিন লাদেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের জন্য ১৯৯৮ সালে প্রস্তুত করা একটি শীর্ষ গোপন নথিতে আল-কায়েদার লক্ষ্য হিসেবে ভারত ও পাকিস্তানের নাম উঠে এসেছে।
৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে সিআইএর প্রকাশ করা এক বিশাল নথিপত্র থেকে এই তথ্য সামনে এসেছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর সিআইএ প্রায় ৭১টি গোয়েন্দা প্রতিবেদন জনসমক্ষে আনে, যা ৯/১১ সংক্রান্ত রেকর্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকাশনা। ‘বিন লাদেন টেররিস্ট নেটওয়ার্ক স্টিল এ থ্রেট’ শীর্ষক ১৯৯৮ সালের ২৮ আগস্টের একটি নথিতে বলা হয়েছে, ভারত ও পাকিস্তানসহ একাধিক দেশে হামলার ইচ্ছা ছিল বিন লাদেনের।
এতে বলা হয়, তিনি ‘মিশর, আরব উপদ্বীপ বিশেষ করে কুয়েত, সৌদি আরব এবং ইয়েমেন, ভারত, পাকিস্তান, উগান্ডা এবং সম্ভবত নাইজেরিয়াতে’ হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। ওই নথিতে আরও বলা হয়, আলবেনিয়ার তিরানা এবং আজারবাইজানের বাকুতে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া বিন লাদেনের অপারেটিভদের গ্রেফতার করতে সহায়তা করেছিলেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
নথিটিতে ভারতের জন্য কোনও নির্দিষ্ট হামলার পরিকল্পনার বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়নি। তবে এটি দেখায় যে ৯/১১-এর তিন বছরেরও বেশি সময় আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভারত ও পাকিস্তানকে এমন দেশ হিসেবে মূল্যায়ন করেছিল যেখানে বিন লাদেনের নেটওয়ার্ক হামলার পরিকল্পনা করেছিল।
নাইরোবি এবং দার এস সালামে ১৯৯৮ সালের ৭ আগস্ট মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলার কয়েক সপ্তাহ পরে এই সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। ওই হামলায় ২২৪ জন নিহত হন এবং বিন লাদেন ও আল-কায়েদা মার্কিন সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তাদের বিশেষ নজরে চলে আসে।
এর তিন বছর পর ভারত একটি বড় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়। ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বরে লস্কর-ই-তাইবা এবং জইশ-ই-মোহাম্মদের সন্ত্রাসীরা নয়াদিল্লিতে সংসদ ভবনে হামলা চালায়। নিরাপত্তা কর্মী ও একজন মালিসহ নয়জন এই হামলায় নিহত হন; পাঁচ হামলাকারীও মারা যায়। এই সংসদ ভবন হামলাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার তিন মাস পরে ঘটেছিল।
পরবর্তীতে পাকিস্তান বিন লাদেন ও আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসন্ধানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে। সিআইএর ৯/১১ নথিতে দেখা যায়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিন লাদেনের কার্যক্রম এবং তালেবানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিল। এর পরের একটি মূল্যায়নে, ২০০০ সালের জুনে শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তান প্রেসিং বিন লাদেন নেটওয়ার্ক’।
বিন লাদেন তার জীবনের শেষ বছরগুলো পাকিস্তানে লুকিয়ে কাটিয়েছিলেন। ২০১০ সালে একটি গোয়েন্দা তথ্যে তার একজন কুরিয়ারকে ইসলামাবাদের কাছে অ্যাবোটাবাদের একটি কমপাউন্ডের সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়। ২০১১ সালের ২ মে মার্কিন বাহিনী সেখানে এক অভিযানে বিন লাদেনকে হত্যা করে।
সিআইএর রেকর্ডগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য হামলা নিয়ে ১৯৯৮ সালের জুলাইয়ের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ, বিমান ছিনতাই নিয়ে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরের সতর্কতা এবং ২০০১ সালের ৬ আগস্টের ‘বিন লাদেন ডিটারমাইনড টু স্ট্রাইক ইন ইউএস’ শীর্ষক ব্রিফ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ১৯ জন আল-কায়েদা সন্ত্রাসী যুক্তরাষ্ট্রের চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে। আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত হানে, এরপর ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৭৫ সাউথ টাওয়ারে আঘাত করে। পরবর্তীতে দুটি টাওয়ারই ধসে পড়ে। আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৭৭ পেন্টাগনে আঘাত হানে। পেনসিলভানিয়ায় বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। সেই ঘটনায় ১৯ জন ছিনতাইকারী বাদে মোট ২,৯৭৭ জন মানুষ নিহত হন।
আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা ওসামা বিন লাদেন এই হামলার নেপথ্যে থেকে সংগঠনকে পরিচালনা করেছিলেন। তিনি ছিনতাইকারীদের একজন ছিলেন না। এই চক্রান্তটি বেশ কয়েক বছর ধরে বিকশিত হয়েছিল। ৯/১১ কমিশন যাকে হামলার ‘প্রধান স্থপতি’ বলে অভিহিত করেছে, সেই খালিদ শেখ মোহাম্মদ এই পরিকল্পনা নিয়ে বিন লাদেন এবং অন্যান্য আল-কায়েদা নেতাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস