মার্কিন চাপে জাতিসংঘের প্রস্তাব থেকে তদন্ত ক্ষমতা বাদ দেয় ফিলিস্তিন

জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে (এইচআরসি) দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে সংঘটিত অপরাধ তদন্তের জন্য একটি বিশেষ প্রক্রিয়া গঠনের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের চাপে দুর্বল হয়ে গেছে। মার্কিন এক কর্মকর্তা ও ইউরোপীয় কূটনীতিকের ব্রিফিং পাওয়া এক সূত্র মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

এই সপ্তাহে পরিষদে গৃহীত চূড়ান্ত প্রস্তাবনায় কেবল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে ‘প্রক্রিয়া গঠন বিবেচনার’ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে আগের খসড়ায় সরাসরি এই প্রক্রিয়া গঠনের কথা ছিল—যা সিরিয়া ও মিয়ানমারে গুরুতর অপরাধ তদন্তে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 

প্রস্তাবনা পাসের আগে ৩১ মার্চ মার্কিন হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি ও সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির চেয়ারম্যানরা জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসকে চিঠি দিয়ে হুঁশিয়ারি দেন, এমন প্রক্রিয়াকে সমর্থনকারী দেশ বা সংস্থার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। 

চিঠিতে বলা হয়, ‘স্পষ্ট করে বলছি, এইচআরসির কোনও সদস্য রাষ্ট্র বা জাতিসংঘ সংস্থা যদি ইসরায়েলকে নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রক্রিয়া সমর্থন করে, তাহলে আইসিসির মতো তাদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।

তবে প্রাপ্ত খসড়া থেকে স্পষ্ট, চিঠি পাঠানোর কয়েক দিন আগেই প্রক্রিয়া গঠনের বিষয়টি প্রস্তাবনা থেকে বাদ পড়েছে। 

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে চাপ

এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (পিএ) আমরা সফলভাবে রাজি করিয়েছি তদন্ত মিশনের অনুরোধ দুর্বল করতে। প্রস্তাবনার ভাষা পরিবর্তন করে ‘গঠন বিবেচনা’ করা হয়। 

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও জেনেভায় তাদের মিশন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। 

দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে বেশ কিছু তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান, যার সাথে এই প্রস্তাবিত প্রক্রিয়া সমন্বয় করতে পারত।  এর মধ্যে আছে ২০১৪ সালের ১৩ জুন থেকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি)। এছাড়া ২০২১ সালের ১৩ এপ্রিলের পর থেকে পূর্ব জেরুসালেমসহ ফিলিস্তিনি ভূমিতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করছে এইচআরসি গঠিত কমিশন অব ইনকোয়ারি (সিওআই)। 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস প্রোগ্রামের সহ-পরিচালক বালকিস জারাহ বলেন, আইসিসি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর ফোকাস করে এবং সীমিত সম্পদের কারণে কয়েকটি মামলাই শুধু নিতে পারে। অন্যদিকে সিওআই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে আনে এবং সুপারিশ করে, তবে এটি ফৌজদারি তদন্তেও সহায়তা করতে পারে। 

জারাহ বলেন, এই প্রক্রিয়া নিম্ন থেকে উচ্চস্তরের অপরাধীদের তদন্তে সহায়তা করতে পারত। সিরিয়ার জন্য ২০১৬ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন প্রক্রিয়ার কাজ সুইডেন, জার্মানি ও ফ্রান্সে সিরিয়ার কর্মকর্তাদের বিচারে সহায়তা করেছে। 

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা

দুই সাবেক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, মার্কিন চাপে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নতি স্বীকার স্বাভাবিক।  একজন বলেন, গত নভেম্বরে আইসিসি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষমন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, এটি তাদের কূটনীতির ফল। কিন্তু আদালতের রায় বাস্তবায়নে তারা কোনও চাপ তৈরি করেনি। 

তিনি বলেন, পিএ কেন ফ্রান্স, ইতালি ও গ্রিসের রাষ্ট্রদূতদের তলব করেনি, যখন তারা নেতানিয়াহুকে জাতিসংঘে যেতে তাদের আকাশসীমা খুলে দিয়েছে? 

সাবেক এই কর্মকর্তার মতে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েল কর্তৃক পশ্চিম তীর দখলের মার্কিন সমর্থন এড়াতে চাইছে। কিন্তু তারা কোনও নিশ্চয়তা পায়নি। 

পশ্চিম তীরের অর্থনীতি ধসে পড়েছে, মার্কিন সাহায্য বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের কাছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দুর্নীতিবাজ ও ইসরায়েলের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। 

দ্বিতীয় সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ১৭ বছর ধরে নির্বাচন না হওয়ায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বৈধতা ইসরায়েলের হাতে। দখলদারিত্বের সাথেই তাদের অস্তিত্ব জড়িত। এই সম্পর্ক ছিন্ন করার ক্ষমতা তাদের নেই।