১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম পবিত্র রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের দিনে বন্ধ করে দেওয়া হলো মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদ। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মসজিদ চত্বর সিলগালা করে রাখায় হাজার হাজার মুসল্লি পবিত্র এই স্থানের যতটা সম্ভব কাছে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকালে দেখা গেছে, শত শত মুসল্লি ওল্ড সিটির (পুরানো শহর) বাইরে নামাজ পড়ছেন। কারণ ইসরায়েলি পুলিশ আল-আকসার প্রবেশপথগুলোতে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের দোহাই দিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই রমজান মাসে মুসলিমদের জন্য আল-আকসা চত্বর কার্যত বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। কর্মকর্তারা একে নিরাপত্তার খাতিরে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করলেও ফিলিস্তিনিরা বলছেন, এটি পবিত্র এই স্থানের ওপর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করার একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
মুসলিমদের কাছে আল-হারাম আল-শরিফ হিসেবে পরিচিত এই চত্বরে সপ্তম শতকের ডোম অব দ্য রক অবস্থিত। অন্যদিকে ইহুদিদের কাছে এটি টেম্পল মাউন্ট হিসেবে পরিচিত।
জেরুজালেমের ৪৮ বছর বয়সী বাসিন্দা হাজেন বুলবুল বলেন, ঈদের দিন হবে জেরুজালেমের মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে দুঃখের দিন। আমি ভয় পাচ্ছি এটি একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করছে। এটি প্রথমবার হতে পারে, কিন্তু শেষবার নয়। ৭ অক্টোবরের পর থেকে পবিত্র এই শহরে ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ বেড়েই চলেছে।
বিগত মাসগুলোতে ওল্ড সিটিতে ফিলিস্তিনি মুসল্লি এবং ধর্মীয় কর্মীদের গ্রেফতারের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি অবৈধ সেটেলারদের অনুপ্রবেশও বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার ঈদের আমেজ থাকার বদলে ওল্ড সিটি ছিল জনশূন্য ও নিস্তব্ধ।
স্থানীয় দোকানিদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কেবল ফার্মেসি ও অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যের দোকান ছাড়া সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতির কারণে তারা তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।
আল-আকসার খতিব এবং জেরুজালেমের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শেখ ইকরিমা সাবরি এক ফতোয়ায় মুসলিমদের মসজিদের নিকটতম স্থানে ঈদের নামাজ পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পুরো এলাকায় ভারী নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এবং তল্লাশি অভিযানের কারণে যে কোনও সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আল-আকসা বন্ধের এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আরব লিগ। এক যৌথ বিবৃতিতে ওআইসি, আরব লিগ এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশন বলেছে, এই পদক্ষেপ জেরুজালেমের ঐতিহাসিক ও আইনি স্থিতাবস্থার পরিপন্থি এবং এটি বিশ্ব মুসলিমদের অনুভূতির ওপর এক চরম আঘাত।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলকে এই অবৈধ ও উস্কানিমূলক পদক্ষেপের সব পরিণতির দায়ভার বহন করতে হবে।
আল-কুদস ইউনিভার্সিটির মিডিয়া ইউনিটের পরিচালক খলিল আসালি বলেন, এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বড় বিপর্যয়। ইসরায়েলিরা যখন তরুণ ফিলিস্তিনিদের আল-আকসার কাছে নামাজ পড়ার চেষ্টা করতে দেখে, তখন তারা তাদের তাড়া করে এবং নামাজের মাঝখানেই লাথি দিয়ে বের করে দেয়।
জেরুজালেমের উত্তেজনার মাঝে গাজায় চলছে এক চরম মানবিক বিপর্যয়। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ঈদের প্রস্তুতি নিচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। গাজার ঈদ এখন শোক আর ক্ষণস্থায়ী আনন্দ, ক্ষুধা আর উদযাপন এবং শোক আর টিকে থাকার লড়াইয়ের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
উত্তর গাজা থেকে দেইর আল-বালাহতে বাস্তুচ্যুত হওয়া সাদিকা ওমর (৩২) বলেন, ঈদের আনন্দ এবার অপূর্ণ। আমাদের প্রত্যেকের ওপর ভারী বোঝা রয়েছে। কেউ ঘর হারিয়েছে, কেউ হারিয়েছে স্বজন। আমার স্বামী অনেক দূরে, সীমান্ত বন্ধ থাকায় সে ফিরতে পারছে না।
খান ইউনিসের আলা আল-ফাররা (৪৯) বলেন, বিগত বছরগুলোর চেয়ে এবারের ঈদ খুব একটা আলাদা নয়। হঠাৎ বিমান হামলার ভয়ে আমাদের চলাচল সীমিত।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদ ফিলিস্তিনিদের জন্য কেবল উৎসব নয়, বরং স্মৃতি আর শোকের মধ্য দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক লড়াই।
এর মাঝেও কিছু ঐতিহ্যের ছোঁয়া দেখা গেছে। আশ্রয় শিবিরগুলোতে ভাঙাড়ি পুড়িয়ে তৈরি চুলায় ‘কায়েক’ ও ‘মামুল’ পেস্ট্রির সুবাস পাওয়া গেছে। বাজারে কিছু মিষ্টি দেখা গেলেও অভাবের কারণে অনেকের পক্ষেই তা কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার রাফাহ সীমান্ত দিয়ে কিছু জাতিসংঘের ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের অনুমতি পাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও গাজাবাসীর মনে ভয় কাটেনি। গাজা সিটির খুলুদ বাবা (৪২) বলেন, গত সপ্তাহেও ইফতারের সময় বিমান হামলার ভয়ে মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে। এই ভয় নিয়ে ঈদ উদযাপন করা কঠিন।