ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের দামামায় এক কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলো। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিলে নিজেদের দেশের ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়ার ভয়। অন্যদিকে ইরান অবরুদ্ধ করে রাখা জাহাজ চলাচলের পথ হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা। এই দুই সংকটের মাঝখানে পড়ে ইউরোপীয় নেতারা এখন কার্যত ‘শাঁখের করাত -এ আটকা পড়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
সম্প্রতি ইউরোপীয় নেতাদের ওপর তোপ দেগেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে ইউরোপের অনীহাকে কটাক্ষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘তারা তেলের চড়া দাম নিয়ে অভিযোগ করে, অথচ এই দাম কমানোর জন্য যে সামান্য সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা নিতে তারা অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।’
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো ইউরোপ মহাদেশজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। জার্মানিতে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ২ ইউরো (গ্যালন প্রতি ৯.৪৮ ডলার) ছাড়িয়ে গেছে। চড়া দামের প্রভাব কমাতে জার্মানি ও অন্যান্য দেশগুলো কর ছাড় এবং দামের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণের মতো ব্যয়বহুল পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ওয়েস্টম্যাকট বলেন, ‘ট্যাঙ্কার চলাচল ও বাণিজ্য সচল রাখতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং উপসাগরীয় ছোট দেশগুলোর কাছে নিজেদের নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে প্রমাণ করা ইউরোপের জন্য অত্যন্ত জরুরি।’ কিন্তু সমস্যা হলো, ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন যুদ্ধবিরোধী হাওয়ায় উত্তাল। বিশেষ করে বামপন্থি দলগুলো এই যুদ্ধকে ‘অপ্রয়োজনীয় ও অবৈধ’ বলে আখ্যা দিচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বিচার বিভাগীয় সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটে হেরে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হওয়ার খেসারত তাকে দিতে হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফ্রান্সে মধ্যপ্রাচ্যে হস্তক্ষেপের বিরোধী কট্টর বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবোড গত সপ্তাহের মেয়র নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে ক্ষুব্ধ মুসলিম ভোটারদের সমর্থন তাদের এই জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ফ্রান্সের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেরার্ড আরাউড আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা বরাবরের মতোই বিভক্ত। ইউরোপীয়রা সব স্তরেই তাদের দুর্বলতা প্রকাশ করছে। যা ঘটছে তাতে আমরা পুরোপুরি স্তম্ভিত।’
ট্রাম্পের চাপের মুখে থাকলেও ইউরোপীয় নেতাদের পক্ষে তাকে সমর্থন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর যৌথ হামলা চালায়, তখন তারা মিত্রদের সঙ্গে কোনও পরামর্শ করেনি, এমনকি আগেভাগে জানায়নি পর্যন্ত।
এর ওপর যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আক্রমণ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে তুলনা করে উপহাস করেছেন ট্রাম্প। ন্যাটোতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকোলাস বার্নস বলেন, ‘ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ট্রাম্পের এই অবমাননাকর মন্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের জন্য এই যুদ্ধে অংশ নেওয়াকে রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব করে তুলেছে।’
পেন্টাগন ও কূটনীতিকদের মতে, ট্রাম্প আসলে ইউরোপের সামরিক শক্তি চাইছেন না; তিনি চাইছেন এই যুদ্ধের একটি রাজনৈতিক বৈধতা। ফ্রান্সের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মিশেল ইয়াকোভলেফ বলেন, ‘ট্রাম্প যেহেতু ইউরোপের সামরিক অবদানের গুরুত্বকে উড়িয়ে দিয়েছেন, তার মানে তিনি আসলে একটি রাজনৈতিক ঢাল চাইছেন।’ ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই কৌশলগত অস্পষ্টতার মধ্যে তাকে রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ এখন পর্যন্ত ট্রাম্প যুদ্ধের কোনও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা যুদ্ধ শেষ করার কোনও পথ দেখাতে পারেননি।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ পর্দার আড়ালে কাজ করছেন যাতে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে জাতিসংঘের অনুমোদন পাওয়া যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই অঞ্চলে তাদের নৌ-সুরক্ষা মিশনের পরিধি বাড়ানোর কথা ভাবছে।
জেরার্ড আরাউড মনে করেন, ইউরোপ এখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু তিনটি কারণ তাদের হাত বেঁধে দিয়েছে। আর সেগুলো হলো, ইউরোপের প্রতি ট্রাম্পের চরম অবিশ্বাস, ট্রাম্পকে চটালে তিনি ইউক্রেনকে শাস্তি দিতে পারেন বলে ইউরোপের ভয় এবং ইরানের পক্ষ থেকেও ইউরোপের প্রতি সন্দেহ।
আরাউড বলেন, ‘আমরা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে পারতাম, কিন্তু ট্রাম্প বরং পাকিস্তানিদের ওপর ভরসা করতে বেশি পছন্দ করেন। অন্যদিকে ইরানিরাও আমাদের বিশ্বাস করে না; তারা মনে করে আমরা মার্কিনিদের পকেটে আছি।’