লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার বিষয়ে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার দুজন মার্কিন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে যুদ্ধবিরতিটি কার্যকর হওয়ার নির্ধারিত সময়ের পরও দুপক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো জানিয়েছে, তাদের গোষ্ঠী এই যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র এই যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েলের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে এই চলমান লড়াইয়ের কারণেই মূলত সুইজারল্যান্ডে শুক্রবারের পূর্বনির্ধারিত মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন, যুদ্ধবিরতি নতুন করে কার্যকর হলে এখন সেই আলোচনা আবার শুরু করা সম্ভব হবে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে লেবাননের ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ইসরায়েলি বাহিনী এখনও দক্ষিণ লেবাননের একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তী চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ থাকলেও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই ধরনের কোনও যুদ্ধবিরতির প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বারবার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এমনকি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক মিত্ররা প্রকাশ্যে এই চুক্তির ওপর আক্রমণ ও সমালোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, বৃহস্পতিবার সকালে লেবাননে ইসরায়েলের চালানো বিমান হামলাগুলো ছিল মূলত মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লেবাননে এই নতুন যুদ্ধবিরতিটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের যৌথ মধ্যস্থতায় সম্পন্ন হয়েছে। এটি স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার নির্ধারিত সময়ের ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যেই দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে বিমান হামলা চালায় এবং এর জবাবে হিজবুল্লাহও উত্তর ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি ড্রোন নিক্ষেপ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওই শীর্ষ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই যুদ্ধবিরতি শতভাগ অনুমোদন করেছেন। তবে নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এখন পর্যন্ত এই দাবির কোনও আনুষ্ঠানিক সত্যতা স্বীকার করা হয়নি। অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এফি দেফরিন বলেছেন, যুদ্ধবিরতির বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ব্যাপার এবং তিনি এ বিষয়ে কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। দেফরিন আরও জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননেই অবস্থান করবে এবং যেকোনও হুমকির বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখবে।
বিপরীতে, হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে যে তাদের গোষ্ঠী এই নতুন যুদ্ধবিরতিটি এখন কার্যকর হয়েছে বলেই বিবেচনা করছে।
বৃহস্পতিবার বিকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং লেবাননে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত সবাই লেবাননে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, বৃহস্পতিবার রাতে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর বেশ কয়েকটি আকস্মিক হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। এতে অন্তত ৪ ইসরায়েলি সেনা নিহত হন। এর পরপরই ইসরায়েল পুরো লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর আস্তানাগুলোতে ব্যাপক ও শক্তিশালী পাল্টা বিমান হামলা শুরু করে। এই তীব্র সংঘাতের জের ধরেই শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মার্কিন-ইরান উচ্চপর্যায়ের আলোচনাটি স্থগিত হয়ে যায়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র আলোচনা স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, আলোচনার উপযুক্ত পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, সুইজারল্যান্ডে এই মুহূর্তে বৈঠকটি করা আমাদের কাছে জরুরি বা তাড়াহুড়োর কিছু নয়, তবে আমরা আগামী দিনগুলোতে এই বৈঠকটি আয়োজনের পরিকল্পনা করছি।
সূত্র: অ্যাক্সিওস