টানা ষষ্ঠ দিনের মতো মার্কিন হামলা এবং উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানে ইরানের পাল্টা আঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন এক চরম সংঘাতের আবর্তে আটকে গেছে। দুপক্ষই ঘোষণা করেছে যে যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং আলোচনার জন্য গত জুনে তারা যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল, তা আর কার্যকর নেই; যদিও উভয়পক্ষই কূটনীতির পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে।
এমন পরিস্থিতিতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান বৃহস্পতিবার উভয়পক্ষকে এই সহিংস হামলা বন্ধ করে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে। ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি বলেন, পাকিস্তান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং অগ্রগতির যৌথ লক্ষ্য অর্জনে ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা, সংলাপ ও কূটনীতির কোনও বিকল্প নেই।
প্রকাশ্য বিবৃতিতে উভয় দেশের নেতারাই ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে তারা সমঝোতা করার জন্য কোনও তাড়াহুড়ো করছেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে ইরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে মরিয়া, তবে তেহরান চুক্তি মেনে চলবে কিনা সে বিষয়ে তার আস্থা নেই। অন্যদিকে, ইরানি কর্মকর্তারা চ্যালেঞ্জিং সুর বজায় রেখেছেন। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বুধবার বলেন, ইরান আমেরিকার সঙ্গে একটি অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে লিপ্ত এবং শান্তি চুক্তি মেনে চলার আর কোনও কারণ তাদের নেই।
কিন্তু মাসের পর মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ কি আসলেই কোনও পক্ষের পক্ষে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব? অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ কীভাবে উভয় দেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখতে পারে?
তেহরানের বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও দুর্বল প্রতিরক্ষা
ইরানের অর্থনীতি কেবল এই যুদ্ধেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং কয়েক দশক ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণেও মারাত্মক চাপে রয়েছে। দেশটির সামরিক অবকাঠামো শক্তিশালী হলেও তা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও হ্রাসের সম্মুখীন হয়েছে।
ইরান বিশ্বের অন্যতম ভারী নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেশটির তেল রফতানি সংকুচিত করেছে, বৈশ্বিক অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করেছে এবং সম্পদ অবরুদ্ধ করেছে। এর ফলে ইরানের মাথাপিছু জিডিপি ২০১২ সালের ৮ হাজার ডলার থেকে কমে ২০২৪ সালে ৫ হাজার ডলারে নেমে এসেছে। দৈনিক তেল রফতানি ২০১২ সালের ২২ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২০২৫ সালে ১৫ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। গত জুনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করে, ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করে এবং ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেয়, যার ফলে ইরানি রিয়াল একদিনেই ১৫ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছিল। তবে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় দুর্বল অর্থনীতির ওপর বড় ধাক্কা লেগেছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরান আক্রমণাত্মকভাবে আঘাত হানলেও, যুদ্ধের প্রথম ধাপে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তাদের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ১ এপ্রিলের মধ্যে ইরান তার যুদ্ধপূর্ব ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের ৩০ শতাংশ এবং ড্রোনের ৬০ শতাংশ শেষ করে ফেলেছে। তাদের বন্দর ও নৌযানসহ নৌ অবকাঠামোর একটি বড় অংশ এবং অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তারা ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর মারাত্মক ক্ষতি করেছিল। গত সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া নতুন মার্কিন হামলা এই চাপ বজায় রেখেছে এবং বৃহস্পতিবার গ্রেটার টুনব দ্বীপের মতো কৌশলগত সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। শুক্রবার ভোরে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলেও হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী।
গত মার্চ ও এপ্রিলে ইরানের হামলার কারণে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক ইতোমধ্যে স্থবির হয়ে পড়েছিল, যা বর্তমানের পাল্টা হামলায় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ রয়েছে। ইরান মার্কিন সামরিক সম্পদে হামলার দাবি করলেও প্রথম ধাপের যুদ্ধে তাদের হামলা সার্বভৌম ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছিল এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছিল। এই সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন তথ্য ভাগাভাগি এবং সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে সামরিক সহযোগিতা জোরদার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের তেলের বাজার, মধ্যবর্তী নির্বাচন ও অস্ত্র সংকট
ট্রাম্পের বড় বড় দাবি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে এবং তেহরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যেত, তবে এই প্রণালিতে ইরানের অবরোধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম ব্যাহত করেছে। এর প্রভাব পড়েছে মার্কিন পেট্রোল স্টেশনগুলোতে, যেখানে যুদ্ধের আগে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ২.৯৮ ডলার থেকে বেড়ে গত মে মাসে সর্বোচ্চ ৪.৬৩ ডলারে পৌঁছায়।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং এর ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ মার্কিন নাগরিকদের কাছে অত্যন্ত অপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চলতি সপ্তাহের একটি ইউগভ জরিপ অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন ট্রাম্প প্রশাসনের এই যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এই যুদ্ধ রিপাবলিকানদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে, যেখানে দলটি কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। কিছু জরিপে ইতোমধ্যে ডেমোক্র্যাটরা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।
সিএসআইএস-এর মতে, মার্কিন অস্ত্রের মজুত এখনও বিপজ্জনক স্তরে না পৌঁছালেও তা কমে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ব্যয়বহুল সাতটি যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে হামলা চালাচ্ছে, যার মধ্যে অন্তত চারটির মজুত যুদ্ধের প্রথম ধাপে অর্ধেক ফুরিয়ে গেছে। ট্রাম্প ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্টের মাধ্যমে বেসরকারি অস্ত্র উৎপাদনকারীদের উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিলেও এগুলো পুনর্পূরণ করতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। অস্ত্রের পেছনে বিলিয়ন ডলার খরচ ছাড়াও সেন্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৪ জুলাই পর্যন্ত ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৪১৪ জন আহত হয়েছেন।
উভয়পক্ষ কি পিছু হটবে?
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলম সালেহ বলেন, অর্থনৈতিক চাপ ও আঞ্চলিক কূটনীতি তেহরানের জন্য উদ্বেগের কারণ হলেও দেশটির নেতৃত্ব এটিকে অস্তিত্বের যুদ্ধ হিসেবে দেখছে এবং তাদের মাথা নত করার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ইরানের অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল এবং এটি এক প্রকার অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন, কারণ তারা দীর্ঘ ৪৭ বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে।
সালেহ আরও জানান, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দুর্বল হিসেবে পরিচিত হতে চায় না এবং দুর্বল সামরিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে কোনও ছাড় দেবে না। ড্রোন উৎপাদনের বিষয়ে মার্কিন গণমাধ্যম জানিয়েছে, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর ইরান দ্রুত ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে এবং বিশ্লেষকদের ধারণা, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তারা ড্রোনের মজুত পুরোপুরি পূরণ করতে পারবে।
তিনি বলেন, তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইরান কোনও চুক্তি করতে প্রস্তুত নয়। যত অর্থনৈতিক চাপই আসুক, ইরান সমঝোতা করবে না এবং প্রতিরোধ ছাড়া তাদের উপায় নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে বিশ্লেষকেরা বলছেন, অস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ কেবল ইরানের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিদের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের বিষয়টিকে ঘিরে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ফিনুকেইন বলেন, প্যাট্রিয়ট মিসাইল ইন্টারসেপ্টর এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের ব্যবহারের হার যে অত্যধিক, তা স্পষ্ট। তিনি আরও বলেন, উদাহরণস্বরূপ চীনের সঙ্গে যেকোনও সামরিক পরিস্থিতির জন্য এই অস্ত্রগুলোর প্রয়োজন হতে পারে।
আলম সালেহ বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ উভয়পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল হলেও এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাগত ক্ষতি বেশি হচ্ছে। চীন ও রাশিয়া এটি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেখছে যে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনও উপায়েই হোক ইরানের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারছে না। এটি প্রমাণ করে যে ইরানের মতো একটি মধ্যম শক্তির দেশকে মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা