কী, কেন, কীভাবে

যুক্তরাষ্ট্রে আস্থা হারিয়ে কেন পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে কুয়েত

ইরানের কয়েক মাসের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো যখন নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনা করছে, তখন পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও জোরালো করার উদ্যোগ নিয়েছে কুয়েত। তবে ইসলামাবাদের জন্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এবং ইরান উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, কুয়েতের পক্ষে সৌদি আরবের মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করা কঠিন হতে পারে।

পাঁচটি সূত্রের বরাতে ১৭ জুলাই ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্প্রসারণ নিয়ে কুয়েত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনা চলছে। আলোচনাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএমডিএ)-এর মডেলে কুয়েতও পাকিস্তানি সেনা, ফাইটার জেটের পাশাপাশি সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাচ্ছে। তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এখন যুদ্ধ-প্রতিরোধী সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান এসএমডিএ চুক্তির মাধ্যমে তাদের বহু দশকের পুরোনো নিরাপত্তা সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়।

হরমুজ প্রণালি ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচলের পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বিদ্যমান নিরাপত্তা অংশীদারত্বের বাইরে অতিরিক্ত সুরক্ষার পথ খুঁজছে।

ঝড়ের মুখে কুয়েত

মধ্যপ্রাচ্যের অন্য যেকোনও দেশের চেয়ে বেশি প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা রয়েছে কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান, ক্যাম্প বুহরিং এবং আলী আল-সালেম বিমান ঘাঁটিতে। ফলে ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় দেশটি অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত ১৭ জুলাই ইরানের এক বিমান হামলায় দেশটির একটি বড় বিদ্যুৎ ও পানি শোধন প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা দেশটির অধিকাংশ পানীয় জল সরবরাহ করে থাকে।

২০২৩ সাল থেকে কুয়েত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ এবং যৌথ মহড়া সংক্রান্ত একটি সীমিত নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে। তবে এটিকে সৌদি আরবের মতো কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দিতে হলে দুই দেশকেই বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক বাধা পার হতে হবে।

নিরাপত্তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষক জুনায়েদ জাভেদ বলেন, পাকিস্তান তার সীমান্ত থেকে সরাসরি যুদ্ধ-প্রতিরোধী সেনা না পাঠিয়ে, পৃথক কমান্ডের অধীনে প্রশিক্ষক মিশন বা মেয়াদি সেনা পাঠাতে পারে। এটি প্রকাশ্য কোনও কাঠামো না হলেও এর মাধ্যমে পাকিস্তান তাদের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান বজায় রেখে উপসাগরীয় অংশীদারদের সহায়তা করতে পারবে।

ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর পরিচালক আবদুল্লাহ খান অনুমান করেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে প্রশিক্ষণ ও সামরিক সরঞ্জামসহ অহিংস উপস্থিতির এই সীমিত চুক্তির সম্ভাবনা ৬৫ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ। তবে সৌদি মডেলে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাবনা মাত্র ৩০ শতাংশ।

প্রতিরক্ষা শিল্প বিষয়ক পরামর্শক হায়দার এম হোসেন জানান, পাকিস্তানি এই সরঞ্জামগুলো মার্কিন বা কুয়েতি কমান্ডের অধীনে নয়, বরং নিজস্ব কমান্ডে পরিচালিত হবে। এর ফলে পাকিস্তান তাদের অপারেশনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখে ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতার সুযোগ বজায় রাখতে পারবে।

উপসাগরীয় সংঘাতে কি পাকিস্তান জড়াবে?

উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুথি বিদ্রোহীদের নৌ অবরোধের মুখে রিয়াদ যখন হুমকির সম্মুখীন, তখন ইসলামাবাদ কূটনীতির পথ ধরেছিল। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনির পাকিস্তান সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়। তবে এর পরপরই পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতি তাদের ‘অবিচল সমর্থন’ প্রকাশ করে হুথিদের সতর্ক করে। যার কয়েক ঘণ্টা পরই হুথিরা দুটি সৌদি জাহাজে হামলা চালায়।

এমনকি পাকিস্তান যদি অহিংস ভূমিকায় থাকে, তবু ঝুঁকি থেকে যায়। জাভেদ মনে করেন, পাকিস্তানি চালিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যদি ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন বা মিসাইল ধ্বংস করে, তবে তেহরান এটিকে পাকিস্তানের পদক্ষেপ হিসেবেই দেখবে।

তবে হোসেনের মতে, ইরান পাকিস্তানের কৌশল বোঝে এবং তারা পাকিস্তানের এই দ্বৈত ভূমিকা মেনে নিয়েছে। তিনি জানান, ইরানের ওপর মার্কিন হামলা চলা সত্ত্বেও তেহরান পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ নৌমহড়া চালিয়েছে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

অন্যদিকে আবদুল্লাহ খান মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের গভীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরানই সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং দেশের ভেতরে তেহরানবিরোধী যুদ্ধে জড়ানোকে রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়। এছাড়া সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পারমাণবিক চুক্তিও সৌদি-ইরান দ্বন্দ্বকে আরও বাড়াতে পারে, যা পাকিস্তানের ভারসাম্যের নীতিকে চাপে ফেলবে।

প্রতিরক্ষা চুক্তির আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা

সম্প্রতি কেবল কুয়েত নয়, অন্যান্য উপসাগরীয় দেশও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা ভাবছে। এছাড়া বাহরাইন ও জর্ডানও পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে আলোচনা করেছে।

ইসলামাবাদের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্ট্যাবিলিটি-এর প্রধান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসিফ হারুন রাজা বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ‘আস্থা হারানোর’ কারণেই উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প সুরক্ষার ছাতা খুঁজছে। ইরানের হামলায় উদ্বিগ্ন কুয়েতও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের বিনিময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি করতে আগ্রহী।

পাকিস্তানের কৌশল কি টেকসই?

ইসলামাবাদের জন্য এই প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার একটি বড় সুযোগ। আবদুল্লাহ খানের মতে, কুয়েতের বর্তমান নিরাপত্তাহীনতাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত প্রভাব কমিয়ে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে চায়। তাই পাকিস্তান কোনও বড় ঝুঁকিপূর্ণ চুক্তি না করে উপদেষ্টা, সামরিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ আদান-প্রদানের প্যাকেজে যেতে পারে।

তবে জাভেদের মতে, এই কৌশলের সাফল্য নির্ভর করবে মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাতে অংশ না নিয়ে ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বজায় রাখার ঐতিহাসিক নীতির ওপর। ইরান অতীতে পাকিস্তানের কৌশল মেনে নিলেও বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে তারা এটিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীলভাবে দেখতে পারে। ফলে কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রেখে এই সামরিক কূটনীতিকে অর্থনৈতিক লাভে রূপান্তর করাই এখন পাকিস্তানের মূল চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: আল-মনিটর