চলতি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ওয়াশিংটন ও রিয়াদ থেকে আসা পর পর কয়েকটি ঘোষণা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সৌদি আরবের মদিনা অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ আকরিক ও দুর্লভ খনিজের সন্ধান পাওয়ার ঘোষণার ঠিক তিন দিন পর, সৌদি আরবের কাছে ২ হাজার ৪৩০ কোটি (২৪.৩ বিলিয়ন) ডলার মূল্যে ৪৮টি এফ-৩৫ লাইটনিং-২ স্টিলথ ফাইটার জেট বিক্রির সম্ভাব্য অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর। এই প্রথম কোনও আরব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই সর্বাধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান পেতে যাচ্ছে।
এমন একসময়ে এই দুই ঘটনা ঘটলো, যখন ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহযোগিতা পাচ্ছে না এবং ওয়াশিংটন-হুথিদের মধ্যে গোপন বৈঠকের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে কৌশলগত সুবিধা পেতে সৌদি আরব কি নিজেদের অর্থনৈতিক ও খনিজ সম্পদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে?
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, এই ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য নষ্ট করবে না, বরং প্রধান অ-ন্যাটো মিত্রের নিরাপত্তা জোরদার করবে। ওয়াশিংটনে সৌদি দূতাবাস এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, প্রস্তাবিত এফ-৩৫ বিক্রি সৌদি-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারত্বের শক্তি এবং আমাদের বজায় থাকা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অগ্রগতি নির্দেশ করে।
এই গুঞ্জনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে চীনের নেতৃত্বাধীন প্রজেক্ট এমব্রিজ ডিজিটাল কারেন্সি প্রকল্প থেকে সৌদি আরবের সরে আসার খবর। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হওয়া এই প্রকল্প থেকে আন্তর্জাতিক চাপ ও নজর এড়াতে রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়িয়েছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, প্রথমে ইউরেনিয়াম আবিষ্কার, এরপর যুক্তরাষ্ট্র-হুথি আলোচনার খবর, এফ-৩৫ বিক্রির অনুমোদন এবং চীনের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ থেকে সরে আসার মতো পর পর ঘটনাগুলো রিয়াদের এক সুচতুর ও উচ্চঝুঁকির বাণিজ্যিক কূটনীতির অংশ।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাধারণ সম্মেলনে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুলআজিজ বিন সালমান মদিনার জাবাল সাইদ প্রকল্পে প্রায় ১১০ মিলিয়ন টন খনিজ কাঁচামাল পাওয়ার কথা জানান। গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই ইউরেনিয়াম আবিষ্কার রিয়াদের নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পথকে সুগম করতে পারে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিরা তাদের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করে বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে অগ্রসর হলেও যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের পক্ষে সামরিক সংঘাত বাড়াতে নারাজ। ওমানের মাস্কাটে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হুথিদের গোপন বৈঠক হয়েছে এবং তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডিপি পান্ডে এক এক্স পোস্টে মন্তব্য করেন, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য না করে একপ্রকার চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে সৌদি আরব এখন ২ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কিনে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবসা দিচ্ছে, যা হুথিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো খুব বেশি কাজে আসবে না।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, গেরিলা কায়দায় লড়াই করা হুথিদের বিরুদ্ধে এফ-৩৫-এর মতো হাইটেক স্টিলথ ফাইটার জেটের কার্যকারিতা বেশ সীমিত। তা ছাড়া, মার্কিন কংগ্রেসে ২০১৮ সালের সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড এবং ইয়েমেন যুদ্ধে বেসামরিক প্রাণহানির বিষয় নিয়ে এই চুক্তির বিরোধিতা হতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কের কারণে এফ-৩৫ প্রযুক্তির তথ্য বেইজিংয়ের হাতে পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে এসব বিতর্ক সত্ত্বেও এটি স্পষ্ট যে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরব তাদের অর্থ ও খনিজ সম্পদের সমীকরণ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের পাল্লা ভারী করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে